শুভাপ্রসন্ন

মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু • সম্পাদনা সুশোভন অধিকারী • লালমাটি • ৪০০ টাকা

ভারতের আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাস ইউরোপের তুলনায় নেহাতই নবীন। যদিও সামগ্রিকভাবে ভারতীয় শিল্প, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, প্রাচীরচিত্রের ইতিহাস আর বৈশিষ্ট্য শুধু অন্যতম প্রাচীনই নয়, এক বিশেষ ছন্দবৈভবে বিশিষ্ট। নানা কারণে সেই ধারাবাহিকতা থেকে ভারতীয় শিল্পশৈলী বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বিশেষভাবে মোঘল সাম্রাজ্যের পর দীর্ঘদিন ব্রিটিশ শাসন তার নানা প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, তারই পাশাপাশি বিশ্বমহাযুদ্ধ, আধুনিক শিল্প–‌বাণিজ্যের আন্দোলন প্রভৃতির চাপে পরম্পরা থেকে প্রায় ছিন্ন হয়েছিল স্বাভাবিক ধ্যান ও সৃষ্টিশীলতা। থমকে ছিল অনেক কিছুই।
ইংরেজরা আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিল শিল্পশিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে নয়। মূলত ড্রাফটসম্যান তৈরি করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। প্রচারের কাজে বিজ্ঞপ্তি লেখা রেলওয়ের বিভিন্ন কাজে দেশীয় মানুষদের তৈরি করে নেওয়ার জন্য। পরবর্তিকালে ছাত্রদের প্রতিভা, দক্ষতা আর সৃষ্টিশীলতা লক্ষ্য করে আর কিছু শিক্ষক, অধ্যক্ষের উৎসাহে শিল্পশিক্ষার প্রধান অনুশীলনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে আর্ট স্কুলগুলি। হ্যাভেল, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পার্সি ব্রাউন প্রমুখ শিক্ষক আর আর্ট স্কুলের আশ্রিত হয়েও নন্দলাল বসু ছিলেন স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পী। ভারতীয় দর্শন, জীবনবোধ, প্রকৃতি পরিবেশ জ্ঞান, নন্দনবোধ আর জীবন সারল্যের মধ্যে দিয়ে একদিকে প্রকৃত শিল্পী অন্যদিকে অতুলনীয় শিক্ষক হিসেবে ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথিকৃৎ তিনি আচার্য নন্দলাল বসু।
রবীন্দ্রনাথের দূরদর্শিতা তাঁকে চিনে নিতে ভুল করেনি। পরবর্তিকালে আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রসৃষ্টির রবীন্দ্রস্বপ্নের অন্যতম যে শিক্ষাঙ্গন তার রূপ ও রুচি প্রস্ফুটিত হয়েছিল নন্দলাল বসুর রূপশৈলীর মাধ্যমে।
রবীন্দ্ররূপ তথা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নান্দনিক বিশিষ্টতা তা নন্দলাল বসুর শিল্পবোধ, সৃষ্টিশীলতা আর ছাত্রছাত্রীদের উদ্দীপ্ত করার প্রভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর মাধ্যমে। সে–সময় এক দুর্লভ যুগসন্ধিক্ষণে যেখানে একদিকে রবীন্দ্র–বলয় ঘিরে তাঁর পরিবারের জ্যোতিষ্করা— মনন আর বৌদ্ধিক গুণের সঙ্গে চারুকলা, সাহিত্য–‌সুর–‌সঙ্গীতে মধ্যগগন ভরিয়ে রেখেছিলেন, অন্যদিকে বিদেশের বিদগ্ধ মানুষেরা যুক্ত হয়েছিলেন ভারত ও প্রাচ্যশিল্পের প্রসার ঘটাতে।
তখনও ভারতবর্ষে চারুকলার কোনও যৌথ আন্দোলন সংগঠিত হয়নি। দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু ব্যক্তিশিল্পীর অবদান তা একান্তই ইউরোপীয় শৈলীতে রচিত হত। সেদিক থেকে নন্দলাল বসু আর তাঁর শিল্পগুরু অবনীন্দ্র ঠাকুরকে ঘিরে ভারতীয় আধুনিক শিল্পে বেঙ্গল আর্ট মুভমেন্টের অগ্রণী ভূমিকা অনস্বীকার্য।
শিল্পী, গবেষক, সুলেখক ও অধ্যাপক সুশোভন অধিকারী তাঁর বিশ্বভারতী তথা কলাভবনে শিক্ষা আর অধ্যাপনার কাজে দীর্ঘ সময় ধরে রবীন্দ্রনাথকে শুধু হৃদয়ঙ্গম করেছেন তা–ই নয়, তারই পাশাপাশি তাঁর উপলব্ধি নানাভাবে নানা রচনার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন পাঠকের কাছে দেশে–বিদেশে। স্বাভাবিকভাবে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ তথা রবীন্দ্র–মানসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ মাস্টারমশাই নন্দলাল বসুর অবদান, আশ্রমিক জীবনবৈশিষ্ট্য, শিল্পবৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে তাঁর শিক্ষক, প্রেরণার মানুষেরা, বন্ধুরা আর ছাত্রছাত্রী প্রমুখ প্রতিষ্ঠিত কৃতি পঁয়তাল্লিশ জনের লেখনীকে এই গ্রন্থে গ্রথিত করে সুশোভনবাবু তাঁদের বর্ণনায় উপলব্ধিতে, সান্নিধ্য আর শিক্ষক ও গুরু হিসেবে যাঁরা আলোকিত হয়েছিলেন তাঁদের চিত্রায়ণে শিল্পী, শিক্ষক আর মানুষ নন্দলাল বসুকে প্রকাশ করেছেন।
এরই সঙ্গে ভারতের আধুনিক শিল্প আন্দোলনে স্বদেশি চেতনা, স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি ও তার পথিকেরা আমাদের কাছে উজ্জ্বল হয়েছেন। অন্যদিকে সে–সময়ে কীভাবে বিশ্বভারতী এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের কেন্দ্রভূমি হয়ে উঠেছিল, রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নকে কীভাবে নন্দলাল নান্দনিকভাবে সার্থক করেছিলেন, ভারতবর্ষে প্রধান ব্যক্তিত্বরা একদিকে রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু থেকে অন্যদিকে সিস্টার নিবেদিতা, জগদীশচন্দ্র বসু প্রমুখ সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সঙ্গে নানান কর্মকাণ্ড ঘিরে তাঁর সময়ের জীবনছবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছে এই গ্রন্থে।
ভারতের আধুনিক শিল্প আন্দোলনের রূপ ফুটে উঠেছিল তাঁরই ছাত্রদের মাধ্যমে। বিনোদবিহারী, রামকিঙ্কর বেইজ, রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্খ চৌধুরি, কে জি সুব্রহ্মনিয়াম, চিন্তামণি করেরা ছড়িয়ে পড়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে, শিল্পী হিসেবে। একজন মহান শিল্পী ও আচার্যের জীবনকে কেন্দ্র করে শিল্প–ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ আকর হয়ে উঠেছে এই গ্রন্থটি। একদিকে রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, অন্যদিকে যামিনী রায়, অর্ধেন্দু গাঙ্গুলি, আর ছাত্রছাত্রীদের পক্ষ থেকে রামকিঙ্কর, বিনোদবিহারী, ইন্দিরা গান্ধী প্রমুখের স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়ন— এরই মধ্যে তাঁর শিল্পগত শৈলীতে রেখাচিত্র, বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাচীরচিত্র, মহাকাব্য আর পুরাণগাথার নানান অসাধারণ ছবি ও তার পরিচয়, বিভিন্ন শিল্পরসিকের চোখে তাঁর ছবির বর্ণনা, বিশ্লেষণ আর বিশিষ্টতা জানা যায়।
অবনীন্দ্র–নন্দলালকে কেন্দ্র করে বাংলা তথা ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার যে আন্দোলন, ঐতিহ্যের পরম্পরা থেকে ব্যক্তিশিল্পীর আধুনিক মনস্কতার প্রকাশ ও জাগরণ— লোকশিল্প থেকে ব্যক্তিবোধে সমাজবোধে, সময়বোধে যে শিল্পের রসদ ও আঙ্গিক গড়ে তোলা, তা থেকে পরবর্তিকালে বিচ্যুত হয়েছে শিল্পসমাজ।
নন্দলাল বসুর শিল্পভাবনায় চারুকলা যেভাবে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করত, মানুষ ও সমাজ যে উপকৃত হতে পারে, সমৃদ্ধ হতে পারে শিল্পচেতনায়, যা মননকে স্পর্শ করে জীবন ও সমাজকে বর্ণময় করতে পারে— সেই গভীর বোধ থেকে আমরা সরে এসেছি ক্রমশ। চারুকলা এখন বুদ্ধি বা মস্তিষ্কের চমক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে ঘোষণাপত্র দেখে শিল্পবস্তুকে বুঝে নিতে হয়। উপলব্ধির জন্য শিল্পবস্তু থেকে একান্ত মনের ঘ্রাণ নিতে হয় না।
অন্যদিকে, অর্থবান ক্ষমতাবান প্রথম পৃথিবীর প্রভাবে স্বকীয়তা, মাটি, প্রকৃতি ঐতিহ্যের প্রয়োজন হচ্ছে না— আর।
এ সবই মনে আসে সুসম্পাদিত ‘‌মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু’‌ গ্রন্থটি পাঠ করে। আশা করি শিল্পপিপাসু সকল মানুষ গ্রন্থটি পাঠের সুযোগ পাবেন আর ঋদ্ধ হবেন— মাটিছোঁয়া মানু্ষ/‌আকাশছোঁয়া শিল্পীকে জেনে। ■ ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top