সঙ্ঘমিত্রা রায়চৌধুরী: এই স্মৃতিকথাটি রূপকথার গল্প হতে পারত। দ্য ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (‌আইএনএ)‌, যাকে আমরা সবাই আজাদ হিন্দ ফৌজ নামে চিনি এবং সুভাষচন্দ্র বসু নামের সোনার কাঠির ছোঁয়ায় ‘‌ঘুমন্ত’‌ মানুষকে জাগিয়ে তোলার গল্প। 
হতে পারত, আইএনএ ও সুভাষচন্দ্র নামের ঝকঝকে খাপখোলা তলোয়ারকে হাতিয়ার করে, এক রাষ্ট্রবিপ্লবের গল্পও। দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিমুখ, অনুগত সৈনিকের সচেতন হয়ে উঠে রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের গল্প, ১৮৫৭–‌র সিপাহী অভ্যুত্থান (বা বিদ্রোহ)–‌এর প্রায় ৯০ বছর পর, এই দ্বিতীয়বার। 
আবার এটা তীব্র উথাল–‌পাথাল দেশপ্রেমের গল্পও বটে। বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধের অশান্ত আবহেও সুভাষচন্দ্র বসু নামক দুঃসাহসী অগ্নিশলাকা আইএনএ নামের সলতে দিয়ে কীভাবে দেশপ্রেমের নিষ্কম্প প্রদীপশিখাটি জ্বালিয়ে তুলেছিলেন স্বদেশের মানুষের বুকে, ধর্ম–‌ভাষা–‌সম্প্রদায়–‌সহ নানা বিভিন্নতা অতিক্রম করে মিলিয়েছিলেন মানুষকে, পরাধীন নাগরিকের বুকের ভেতর মুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছিলেন, সেই গল্প।
লেখক মেজর জেনারেল মহম্মদ জামান কিয়ানি (১৯১০-১৯৮১) ব্রিটিশ রাজের অধীনে সৈনিক হিসেবে যুদ্ধজীবন শুরু করলেও, বর্মা ফ্রন্টে থাকার সময়ে অধীন সৈন্যদল–‌সহ আজাদ হিন্দ সরকারে যোগ দেন এবং পূর্বতন প্রভুদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধে নেমে পড়েন। তিনি দ্য ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির প্রথম ডিভিশনের কম্যান্ডার তথা চিফ অফ জেনারেল স্টাফ ছিলেন। ভারতবর্ষ ভেঙে দুটো স্বতন্ত্র রাষ্ট্র তৈরি হলে কিয়ানি তাঁর জন্মভূমি পাকিস্তানেই থিতু হন। একসময়ে তিনি জিয়া–‌উল–‌হকের সরকারে তথ্যমন্ত্রীও হন।
প্রায় জীবনসায়াহ্নে এসে তিনি লেখেন ‘India’s Freedom Struggle And the Great INA’, জীবনের সবচেয়ে উদ্দীপনাময় দিনের অমূল্য অভিজ্ঞতার প্রয়োজনীয় নথি হিসেবে। যাপনের প্রায় ৩৫ বছর পরে লেখা এই স্মৃতিকথা, ৩৫টি কর্মমুখর সংগ্রামময় বছর, তবু যেন হীরকখণ্ডের মতো জ্বলজ্বল করছে প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘটনা। কতখানি সততা, সংবেদন এবং আবেগ জড়িয়ে থাকলে এটা সম্ভব, সহজেই অনুমেয়। এটির বাংলা অনুবাদ করেছেন প্রবীর মুখোপাধ্যায়। এটির ভূমিকা লিখেছিলেন শিশিরকুমার বসু। এই বাংলা সংস্করণের ভূমিকা লিখেছেন সুগত বসু। দুই ভূমিকাই প্রমাণ ঐতিহাসিক নথি হিসাবে বইটির গুরুত্ব কতখানি। 
আমাদের স্বাধীনতাপ্রাপ্তিতে সুভাষচন্দ্রের অবদানকে লঘু করে দেখানোর এক সচেতন প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। অথচ এ নিয়ে লর্ড অ্যাটলি, যিনি ভারতকে স্বাধীনতা দিয়ে ইংরেজ–‌শাসন সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ভারতভ্রমণকালে তিনি কলকাতায় রাজভবনে এসে ওঠেন। সেখানে ভারপ্রাপ্ত রাজ্যপাল ফণিভূষণ চক্রবর্তী তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, এই স্বাধীনতাপ্রাপ্তিতে গান্ধীজি ও তাঁর অহিংস আন্দোলনের প্রভাব কতটা। অ্যাটলি চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিলেন, ‘‌m–i–ni–‌mal’‌। তিনি সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে ভারতীয় স্থলবাহিনী ও নৌবাহিনীতে নিযুক্ত দেশীয় সেনানীদের ইংরেজ শাসনের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তি শিথিল করিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার এই তথ্য উল্লেখ করে আত্মজীবনী ‘‌জীবনের স্মৃতিদীপে’‌তে লিখেছেন, ইংরেজের ভারত ছেড়ে যাওয়ার পিছনে গান্ধীজির চেয়ে সুভাষচন্দ্র ও আইএনএ–‌এর ভূমিকা কম নয়, বরং বেশিই ছিল। আর জে মুলকরের ‘‌আজাদী সৈনিকের ডায়েরি’‌ও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। সেদিক থেকেও মেজর জেনারেল জামান কিয়ানির এই বইটির গুরুত্ব অসীম।
সেইসঙ্গে বইটি একটি অত্যন্ত জরুরি ঐতিহাসিক নথিও বটে। পাশাপাশি পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, এই সময়ে আমাদের চারপাশে জাঁকিয়ে–‌বসা নৈরাজ্য ও নৈরাশ্যের থেকে এক উজ্জ্বল উদ্ধার এই স্মৃতিচারণ। আজকের এই বিভেদমূলক এবং সমস্তরকম ভিন্নতার টুঁটি চেপে ধরা রাজনৈতিক পারিপার্শ্বের চূড়ান্ত অ্যান্টিথিসিস ছিলেন যে মানুষটি, জাতি–‌ধর্ম–‌বর্ণ–‌ভাষার সকল বিভেদ যিনি দেশপ্রেমের পরশপাথরে মুছে দিয়েছিলেন, যাঁর একমুখী গন্তব্য ছিল বিদেশি শাসকের অত্যাচার–‌নিপীড়নমুক্ত স্বাধীন ভারতবর্ষ... তাঁর আদর্শটি আরও বেশি করে জীবনে জড়িয়ে নেওয়া দরকার এই আকালে। সেদিক দিয়েও এই বইটি পাঠকের কাছে অমূল্য।
পরিশেষে, একটি খেদের কথা। অনুবাদটি সহজবোধ্য কিন্তু কোথাও কোথাও গতি কিছুটা কম বলে মনে হয়েছে।  বইটির সার্বিক গুরুত্বের নিরিখে অবশ্য এইটুকু ত্রুটি উপেক্ষা করাই যায়। ■

জনপ্রিয়

Back To Top