রঞ্জন রায়: ‌হার্ড কভারে সুন্দর ছাপা ও বাঁধাই বইটিতে কুড়িটি অধ্যায়, মূল পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৬০। ঋণস্বীকার করা বইয়ের তালিকা‌য় বাংলা ৪৬ ‌ও ইংরেজি ৭৭। বিভিন্ন বিন্দুতে ইংরেজি ও বাংলায় উদ্ধৃতিগুলো মূল্যবান। লেখক যেন বইটি আমার জন্যেই লিখেছেন। শিবাংশুর বুদ্ধ এক মহামানব, যিনি সময়ের থেকে অনেক আগে এসেছিলেন। তবে তিনি ইতিহাসপুরুষ, পৌরাণিক নন। এই মানব বুদ্ধকে তুলে ধরার জন্যে তাঁকে বিভিন্ন মিথ, রূপকথা, অলৌকিক
মহিমার গল্প থেকে মাখনের মতো ছেঁকে বার করতে হয়েছে ইতিহাসের উপাদানকে। জেনে অবাক হই যে, বুদ্ধবচন বলে যা জানি, যা শুনি, তার কোনওটাই বুদ্ধের জীবৎকালে লিপিবদ্ধ নয়, চার–‌চারটে মহাসঙ্গীতির বাধ্যবাধকতায় লেখা। এগুলো ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন কালখণ্ডে, যাদের মধ্যে এক থেকে কয়েক শতাব্দীর ফারাক। আরও জানলাম—বুদ্ধ শাস্তা বা শিক্ষক বটেন, কিন্তু বিচার করতে বলেন। তাঁর ধ্যান কোনও অতীন্দ্রিয় উপাসনা নয়। বরং প্রাত্যহিক জীবনের কোলাহল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে আত্মমগ্ন হয়ে নিবিড় চিন্তা। বুদ্ধ শ্রদ্ধা ও ক্ষমতার শীর্ষে বসে বলেন ‘আত্মদীপো ভব’। নিজেই নিজের পথপ্রদর্শক দীপশিখা হও। নিজের প্রচারিত নীতিকেও অজর অমর বলেন না। মানুষ যেমন নৌকোয় চড়ে নদী পার হওয়ার পর নৌকোকে বালির উপর উল্টো করে রেখে ঘরে যায়, তাঁর উপদেশও এর বেশি সম্মান আশা করে না।
শিবাংশুর বিশেষ কৃতিত্ব অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে মহাযানী দর্শনে সনাতনী দেবদেবীদের নতুন রূপে প্রবেশের বর্ণনাটি। বঙ্গে সহজিয়া সাধনার উৎস হিসেবে মহাযানী বৌদ্ধদর্শনের অবদান নিয়ে চর্চাটিও অত্যন্ত আকর্ষক। সঙ্ঘে ভিক্ষুণীদের স্থান অধ্যায়টি আজকের দিনে একটি জরুরি সংযোজন। 
বইটির মূল প্রতিপাদ্য বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনের আদি স্বরূপকে তুলে ধরা; অর্থাৎ হীনযান এবং মহাযানেরও আগে বুদ্ধের জীবনকালে তাঁর ধর্মাচরণের রূপটি কী ছিল, তা রেখাঙ্কিত করা। বুদ্ধ ঈশ্বর, আত্মা, স্বর্গ–‌নরক, জন্মান্তরবাদ— এসব নিয়ে মাথাঘামানো অর্থহীন মনে করতেন। কারণ তাঁর সাধনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সর্বমানবের কল্যাণ। তিনি যে চার আর্যসত্য পেলেন, তাতে ঈশ্বর/আত্মা/মুক্তি এসব নেই। তাঁর মতে জীবন দুঃখময়। দুঃখের কারণ আছে—তৃষ্ণা বা আকাঙ্ক্ষা। দুঃখের নিরোধ সম্ভব, তৃষ্ণার দমন। কী করে? অষ্টাঙ্গ মার্গ অনুযায়ী জীবনযাপন করে। অর্থাৎ সৎকার্য, সৎচিন্তা আদি আটটি সৎ বিচারের অনুপালন। তাই শিবাংশু বলছেন যে, এটি আসলে প্রচলিত অর্থে ধর্ম নয়, বরং এক জীবনযাপনের নৈতিক গাইড, এতে কোনও পূজার্চনা, বলি বা ভোগ দিয়ে দেবতাকে সন্তুষ্ট করে বর পাওয়ার প্রথা নেই। বরং সমস্ত অতিবাদ ছেড়ে মধ্যমমার্গ অনুসরণ করে তৃষ্ণার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ‘ভব’ বা ‘বিকামিং’–‌এর চক্র থেকে মুক্ত হওয়া— এটাই বুদ্ধ উদ্দিষ্ট নির্বাণ। তাই একে যদি ধর্ম বলতেই হয় তো বলা উচিত ‘সদ্ধর্ম’। এমনকি পতীচ্চসমুৎপাদ বা বুদ্ধ দর্শনের কার্যকারণসম্বন্ধ ব্যাপারটাও সরলভাবে বললে— যা উৎপন্ন হয়, তার বিকাশ হয়ে নাশও হয়। সব অস্তিত্বই ক্ষণিক।
শেষ দুটি অধ্যায়, ‘শাক্যমুনির বাড়ি ফেরা’ এবং ‘বুদ্ধ ও রবীন্দ্রনাথ’ এই বইটিকে এই ধরনের অন্য বইয়ের থেকে আলাদা করেছে।

বুদ্ধ— এক অনন্ত অডিসি • শিবাংশু দে • ঋতবাক • ৭৫০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top