বিশ্বরূপ মুখোপাধ্যায়: কিছুদিন আগে আজকাল–‌এ আজ প্রায় বিস্মৃত বিস্ময়সৃষ্টিকারী শিল্পোদ্যোগী দ্বারকানাথ ঠাকুরকে নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা মানুষটি নিজ উদ্যোগে এক বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন—  কার টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি। কয়লা, রেল, চা, আফিম, মদ, জাহাজ থেকে শুরু করে পনেরো–‌ষোলটি ক্ষেত্রে তাঁর ব্যবসা বিস্তৃত ছিল। তাঁর উত্তরসূরিদের অযত্নে, অবহেলায় সেই সুবিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে অস্তাচলে চলে যায়। দ্বারকানাথের যোগ্য উত্তরসূরি স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মার্টিন অ্যান্ড কোং। যুগ যুগ ধরে সমীহ জাগানো নাম। অট্টালিকা, সৌধ, সেতু নির্মাণে এক এবং অদ্বিতীয়। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ঝুলন্ত হাওড়া সেতু, অ্যাসেম্বলি হাউস, ওয়ালেশ হাউস, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ইমামবাড়া–‌গার্ডেনরিচ— তালিকা বিশাল। প্রতিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্যার রাজেন্দ্রনাথ ও মার্টিন কোম্পানির নাম। স্বামী বিজ্ঞানানন্দ মহারাজ ও স্যার রাজেন্দ্রনাথের যৌথ ভাবনার ফসল বেলুড়ের অনুপম শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির— যা চুনার পাথরে তৈরি। ‘‌রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জি এক বিস্মৃত মহাজীবন’‌ এই বইটি বঙ্গ–‌পাঠককে উপহার দিয়ে অতীব একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেন তরুণ রানা। তাঁকে অকুণ্ঠ সাধুবাদ জানাই। সুলিখিত ১৯১ পাতার বইটিতে তরুণ রানা স্যার রাজেন্দ্রনাথের বাল্যজীবন, কৈশোর থেকে যৌবনে বড় হয়ে ওঠা, সুদীর্ঘ কর্মজীবন, তাঁর সারস্বত সাধনা ও দেশোন্নয়নের ভাবনা, যেমন তুলে ধরেছেন, ঠিক তেমনই তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি, বংশতালিকা, মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানির নির্মিত অট্টালিকা, সৌধ তালিকা, মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবসার পরিধি বর্ণনা করে একটি আকরগ্রন্থ হিসেবে নির্মিত করেছেন। বার্নপুরের ইস্পাত কারখানা ইস্কো যা এখন রাষ্ট্রায়ত্ত, সেটিও স্যার রাজেন্দ্রনাথের হাতে তৈরি। মার্টিন কোম্পানির রেলগাড়ির কথা আজও হাওড়া–‌আমতা বা কৃষ্ণনগর–‌রানাঘাটের অশীতিপর মানুষজনদের মুখে মুখে ফেরে। এ ছাড়া চা, বিদ্যুৎ, সিমেন্ট, কয়লা, জাহাজ কারখানা ইত্যাদি নানাবিধ ব্যবসা তো ছিলই। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বড্ড খেদ ছিল, বাঙালি চাকরি খোঁজে, ব্যবসা করে না। তিনি নিজে বেঙ্গল কেমিক্যাল কোম্পানি গড়ে তুলেছিলেন— যা এখনও রাষ্ট্রায়ত্ত ঠিকই কিন্তু মাথা উঁচু করে ব্যবসা করছে। স্যার রাজেন্দ্রনাথ ও তাঁর সুযোগ্য পুত্র স্যার বীরেন্দ্রনাথ আচার্য সি পি রায়ের সেই খেদ মিটিয়ে দিয়েছিলেন। স্যার রাজেন্দ্রনাথ ১৯৩৬ সালের ১৫ মে ৮২ বছর বয়সে প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুর পর বসিরহাট মহকুমা সম্মিলনীর উদ্যোগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে স্মৃতিসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠানে তদানীন্তন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘‌তাঁর স্মৃতিরক্ষাকল্পে প্রতিকৃতি বা প্রতিমূর্তি স্থাপিত হতে পারে। কিন্তু তাঁর নামানুসারে একটি শিল্পশিক্ষার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই তাঁর স্মৃতির প্রতি যোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা হবে।’‌ যথার্থ প্রস্তাব। উত্তরসূরি বাঙালি সমাজ এইটুকু অন্তত করতে পারত। ■
রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জি— এক বিস্মৃত মহাজীবন • তরুণ রানা 
সূত্রধর • ৩০০ টাকা।‌

জনপ্রিয়

Back To Top