স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্ত
ভুবনজোড়া আসনখানি • সুধীর চক্রবর্তী • লালমাটি • ২৫০ টাকা
লালমাটি থেকে বইমেলায় প্রকাশ হয়েছে সুধীর চক্রবর্তীর লেখা ‘‌ভুবনজোড়া আসনখানি’‌। এই বইয়ে আছে তেরোটি প্রবন্ধ। প্রতিটিরই কেন্দ্রীয় বিষয় সঙ্গীত আর কয়েকজন নামী সঙ্গীতস্রষ্টা ও গায়ক। যেদিন দায়িত্ব পেলাম এই বইয়ের পাঠ–অভিজ্ঞতা ‘‌আজকাল’‌–‌এর পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার, সেদিন থেকে একটা সম্ভ্রম মেশানো উত্তেজনা বোধ করছি। যাঁর লেখা পড়ে গানকে অন্যভাবে দেখতে শিখেছি অনেকটাই, তাঁর লেখা সম্বন্ধে লিখব আমি!‌ এ এক গুরুভার— যা বহন করতে লোভও হয়।
‘‌ভুবনজোড়া আসনখানি’‌–‌তে যে প্রবন্ধগুলি আছে সেগুলি গত ৫৮ বছরের বিভিন্ন সময়ে লেখা, বিভিন্ন সাময়িকপত্রে প্রকাশিত। সেই সব পত্রিকার সব আর এখন বেরোয় না। আজকের পাঠকদের কাছে লেখাগুলি পৌঁছনোর এরকম সঙ্কলন ছাড়া উপায় ছিল না আর।
প্রথম পাঁচটি প্রবন্ধে রয়েছে গানের তত্ত্ব, বিষয়, গায়নের বিবর্তন, শ্রোতাদের মানসিকতার বিবর্তন ইত্যাদি সংক্রান্ত আলোচনা। শেষ প্রবন্ধটা লেখকের প্রিয় দশটি গান নিয়ে তাঁর সুন্দর, নির্মেদ, ব্যক্তিগত অনুভবের প্রকাশ। বাকি লেখাগুলি দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, রামমোহন, কার্তিকেয় চন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ, অমিয়নাথ সান্যাল আর বব ডিলানকে নিয়ে। তাঁদের গান নিয়ে। তাঁদের সঙ্গীতবীক্ষা আর সঙ্গীতবোধ নিয়ে। সব ক’‌টি প্রবন্ধ নিয়ে সবিস্তার আলোচনার তো পর্যাপ্ত পরিসর এটা নয়। আমার সেই ক্ষমতাও নেই। যে কয়েকটি কথা না বললে আমার পাঠ–‌অভিজ্ঞতার সারাংশটুকু পাঠকরা জানতে পারবেন না, সেটুকু বলে উঠতে পারলেই অনেক। ‘‌বাঙালির তাজমহল’‌ প্রবন্ধটা বিষয়–‌অভিনবত্বেই আমার মন ভরিয়ে দিয়েছে। গোটা বইয়ের বেশ কিছু অংশে সমকালের গান তৈরি হওয়া, গান গাওয়া আর গান শোনা নিয়ে এমন কিছু কথা আছে, যা পড়লেই সহমত হতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, এটা তো আমিও বলতে চাই। অথবা মনে হয়, এই কথাটা এইভাবেই বলে দেওয়া দরকার ছিল আরও আগেই। যেমন, ‘‌লোকগীতে শুদ্ধির তাণ্ডব’‌–‌এ এক জায়গায় লেখক বললেন, ‘‌এই দেশে, বিশেষত শহুরে শ্রোতাদের লোকসঙ্গীত শোনবার কোনও প্রস্তুতি নেই।’‌
‘‌একাকী গায়কের নহে তো গান’‌ প্রবন্ধে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রসঙ্গে একটি বাক্য আছে— ‘‌গানের মান যেমনই হোক, শিল্পীদের সংখ্যাগত বিস্ফার ভীতিজনক।’‌ এই কথাটা রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাপিয়ে সমকালীন সব গানের গোটা চালচিত্রে ছড়িয়ে যেতে চায়। গোটা বইয়ে এমন আরও কিছু কথা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যক্ত হয়েছে, কিন্তু বৃহত্তর বৃত্তে প্রসারিত হতে চেয়েছে।
এমন একজন মরমী সঙ্গীতবোদ্ধার অভিজ্ঞতার ঝুলি যত পরিপূর্ণ হয়, তত তাঁর পার্সোনাল ছোঁয়া যে কোনও লেখাকে আরও সুখপাঠ্য করে তুলতে বাধ্য। এই কারণেই এই বইয়ে ‘সংগীতপ্রাণ অমিয়নাথ সান্যাল’, ‘‌বাঙালির তাজমহল’‌ আর ‘‌আমার প্রিয় গান’‌ লেখাগুলিই আমার মনের সবচেয়ে গভীরে প্রবেশ করেছে। ‘‌আমার প্রিয় গান’‌–‌এ লেখকের দশটি প্রিয় গান নিয়ে আলোচনায় তেমন কোনও বিশ্লেষণ নেই। শুধু আছে গানগুলির সঙ্গে ওঁর পরিচয়পর্ব সংক্রান্ত কতকগুলি জ্যান্ত ঘটনার সরস বিবরণ। মনে হয়, আমিও আমার প্রিয় গান নিয়ে বলতে গেলে এভাবেই বলতাম। আমার যেটা প্রিয়, সেটা কেন আমার প্রিয় হল, সেই কৈফিয়ত দেওয়ার দায় আমি মোটেই অনুভব করি না।
এবার তিনটি জরুরি কথা।
এক, বইয়ের সূচনায় আত্মপক্ষের শেষ লাইনে লেখক বলছেন— ‘বইটা ‌নতুন প্রজন্মের সংগীতজিজ্ঞাসুদের কাজে লাগলে কৃতার্থ হব।’‌ পরে দ্বিজেন্দ্রলালকে নিয়ে লেখাটার ভূমিকা অংশে লেখকই বলছেন, ‘‌দীর্ঘকালীন মনোযোগ বা কোনও কিছুর সঙ্গে লাগাতার সম্বন্ধ এখন কেউ পছন্দ করে না।’‌ দেখা যায়, দ্বিজেন্দ্রলালকে নিয়ে প্রবন্ধের ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় গিয়ে লেখক প্রথম দ্বিজেন্দ্রলালের নামোল্লেখ করলেন। স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে প্রবন্ধেও স্বামী বিবেকানন্দের প্রথম উল্লেখ এল ষষ্ঠ পৃষ্ঠায়। ধ্রুপদের আলাপের মতো দীর্ঘ ভূমিকা, অবশ্যম্ভাবী আর নান্দনিক। কিন্তু নতুন প্রজন্মের সঙ্গীতজিজ্ঞাসুদের, যাঁদের মনোযোগের মেয়াদ অল্প, তাঁদের কাছে পৌঁছবে কি না, সেই সন্দেহ হয়। না পৌঁছলে ক্ষতি তাঁদেরই।
দুই, ‘‌আমার প্রিয় গান’‌–‌এ ‘‌আমরা লক্ষ্মীছাড়ার দল’‌ গানটার বিষয়ে লেখক বলছেন, ‘‌সারাজীবনে আজ পর্যন্ত আর কখনও গানটা কারোর কাছে শুনিনি। রেকর্ডেও কি কেউ গেয়েছেন?‌ সম্ভবত না।’‌ কৌতূহলী হয়ে ইউ টিউবের সাহায্য নিতেই দেখলাম পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি (‌নাকি চল্লিশের শেষে?‌)‌ সন্তোষ সেনগুপ্ত আর পূরবী মুখোপাধ্যায়ের মতো দুই নামী শিল্পীর দ্বৈতকণ্ঠে এই গান গাওয়া আছে। আরও কয়েকজনের আছে। খুঁজে পাওয়া সহজ। আর ওই পঞ্চাশের দশকেরই একটা সময়কে লেখক বলছেন, তাঁর গান আহরণের সবচেয়ে উর্বর সময়। তা–ও তিনি এই গান সারা জীবনে আর কারও কাছেই শুনলেন না— এ বড় আশ্চর্য ঘটনা!‌  
‌‌‌তিন, প্রকাশকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই বেশ কিছু মুদ্রণপ্রমাদের দিকে। সবচেয়ে বড় কথা, কয়েকটা ছাপার ভুল রয়ে গেছে উদ্ধৃতি অংশগুলিতে। সে বড় কেলেঙ্কারি কাণ্ড। এই যেমন ‘‌একটা তাজমহল গোড়ো.‌.‌.‌’‌ বলে কোনও গান পিন্টু ভট্টাচার্য গাননি।
সবশেষে একটু নিজেদের দিকে তাকাই। ‘‌গানের দ্বিজেন্দ্রলাল:‌ অনাদর না উপেক্ষা?‌’‌ প্রবন্ধে ‘‌ধনধান্য পুষ্প ভরা’‌ প্রসঙ্গে লেখকের উক্তি— “‘‌আমার জন্মভূমি’‌ অংশ তো তিনবার তিন সুরবিন্যাসে চেষ্টা করলে বহু স্বরের হার্মনি করে গাওয়া যায়। অবশ্য তা এখন তেমন করে গাইবে কে?”‌‌
আবার ‘‌আমার প্রিয় গান’‌–‌এ ‘‌দিন ফুরাল হে সংসারী’‌ গানটির প্রসঙ্গে লেখক আবার বলছেন— ‘‌এখনকার কালে এই গানটা গাইবার মতো আছেই বা কে?‌’‌ এভাবেই একাধিকবার সমকালীন গায়ক–‌গায়িকা আর সঙ্গীতকর্মীদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ একজন সমকালীন গায়ক হিসেবে আ‌মার ছটফটানি বাড়িয়েছে। আমাদের কি কিছুই করার নেই?‌‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top