সোহেলা ঘোষ: একটা মাছ যে একটা জাতির জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা ইলিশ আর বাঙালিকে না দেখলে বোঝা যেত না। ইংরেজিতে অবসেস্‌ড বললে ঠিক, বাংলায় ইলিশ–‌পাগলামি বলা যায়। বর্ষা এল অথচ পাতে এক টুকরো ইলিশ পড়ল না, দুটো গরম ভাত ইলিশের তেল মেখে খাওয়া গেল না, মুচমুচে ভাজা ইলিশ মাছের ডিম চাখা গেল না— জীবন যেন বর্ণহীন হয়ে পড়ল। বঙ্গ জীবনের অঙ্গ ইলিশ নিয়ে তাই যুগে যুগে বহু কাব্য গাঁথা হয়েছে। মঙ্গলকাব্য থেকে সত্যেন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসুর দীর্ঘ সফর। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দু–‌একজন ছাড়া ইলিশ–‌গল্পের ভাঁড়ারও যে ঠাসা তার বিস্তারিত সাবুদ পাঠকদের কাছে পেশ করেছেন মঈনুল হাসান ও মোজাফ্‌ফর হোসেন। তাঁদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে এক দুর্লভ ইলিশ–‌সংগ্রহ ‘‌কল্পে গল্পে ইলিশ’‌। ২৬৫ পাতায় প্রাপ্তি ৩৪টা ছোটগল্প। লেখক তালিকায় রয়েছেন প্রমথনাথ বিশী, গুলজার, নোংথোম্বম কুঞ্জমোহন সিংহ, শৈবাল মিত্র, অমর মিত্র, ইমদাদুল হক মিলন, আফরোজা পারভীনের মতো নামীদামি লেখকেরা। এঁরা গল্পে ইলিশকে কেবল সাংস্কৃতিক কিংবা অর্থনৈতিক উপকরণ হিসাবে চিহ্নিত করতে চাননি, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে নানা ধরনের বঞ্চনার প্রতীক হিসেবেও তুলে এনেছেন। এক দরিদ্র স্কুলশিক্ষক পাকেচক্রে একটি ইলিশ কেনে। আস্ত ইলিশ কারও হাতে দেখলে দাম জিজ্ঞেস করাই বাঙালির দস্তুর। ট্রামে মুখ ফসকে কম দাম বলে ফেলে সেই স্কুলশিক্ষককে কী হয়রানির শিকার হতে হয়, তার সরস এবং বেদনাময় এক গল্প উপহার দিয়েছেন প্রমথনাথ বিশী— ‘‌গঙ্গার ইলিশ’‌। বাংলা প্রবাদ আছে ঘরামির ঘর ছেঁদা। যে জেলে ইলিশ ধরে অন্যের স্বপ্নপূরণ করে, দারিদ্র‌্য তার নিজের ঘরেই ইলিশ চাখার অবসর দেয় না। চাউবা একটাই মাত্র ইলিশ ধরে ঘরে ফিরে আসে। এ মাছ সে বিক্রি করবে না, আসন্নপ্রসবা বড় মেয়েকে নেমতন্ন করে খাওয়াবে। ছোট ছেলেমেয়েরা যখন ইলিশে মশগুল, তখনই ঘরে চাল নেই বলে সেই ইলিশকেও বিক্রি করে দিতে হয় চাউবাকে। ‘‌একটি ইলিশের স্বাদ’‌–‌এ হৃদয়বিদারক কাহিনী বুনেছেন নোংথোম্বর কুঞ্জমোহন সিংহ। গয়না বা শাড়ি নয়, একটা ইলিশও যে যুযুধান দম্পতির মিলন ঘটাতে পারে, ফিরিয়ে দিতে পারে পুরনো ভালবাসা, হোসেনউদ্দীন হোসেন ভারি সুন্দরভাবে ফুটিয়েছেন ‘‌ইলিশ’‌–‌এ। কেউ গল্পে রূপকথাও এনেছেন। যেমন ইমদাদুল হল মিলন। ‘‌ছোট্ট হরিণ ও ইলিশ মাছ বাজি ধরেছিল’‌— এক অন্য ধরনের বন্ধুত্বের গল্প। দারিদ্র্য আর ইলিশের সম্পর্ক যেন মাখামাখি। তাই সংসারের একমাত্র রোজগেরে ছেলের গোপনে মাছ কিনে এনে রাতে মাকে দিয়ে ভাজিয়ে খাওয়া এবং তারপর একে একে বাবা ও ভাইবোনেদের জেগে উঠে ভাগ নেওয়া। সমাজের এক করুণ বাস্তব এবং একই সঙ্গে মানবিক ছবিটা খুঁজে পাওয়া যায় শৈবাল মিত্রের ‘‌ইলিশের রাত’‌–‌এ। ইলিশ ধরতে গিয়ে আঁধির কবলে পড়ে হারিয়ে যায় সেকান্দার। তার সিতারা রোজ পথ চেয়ে থাকে। মঈনুল হাসানের ‘‌বেনে বৌ’‌ মন বিষণ্ণ করে তোলে। সত্যি বলতে সঙ্কলনটির প্রতিটি গল্পই অনবদ্য। প্রতিটারই উল্লেখ করলে ভাল হয়। বলা যায় বাঙালি জীবনে ইলিশ মাছের এক বহুকৌণিক ছবি ফুটে উঠেছে এই সঙ্কলনে। দুই সম্পাদকের কাছে বাংলা সাহিত্য ঋণী থাকবে এই উপহারের জন্য। আনিসুজ্জামান মামুনের প্রচ্ছদ আর অলঙ্করণ বইটির শোভাও বাড়িয়েছে। ■  
কল্পে গল্পে ইলিশ • সম্পাদনা মঈনুল হাসান, মোজাফ্‌ফর হোসেন
মূর্ধন্য • ৮০০ টাকা ‌‌(বাংলাদেশের মু্দ্রায়)

জনপ্রিয়

Back To Top