পায়েল বসু
উজাগর • জগদীশ গুপ্ত সংখ্যা •
সম্পাদনা উত্তম পুরকাইত • ৪৫০ টাকা

‘‌উজাগর’‌–‌এর জগদীশ গুপ্ত সংখ্যার মলাট খুললেই আছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘‌লঘু–‌গুরু’‌ বইখানি পড়বার জবাবদিহিতে। গুরুদেবের বকাবকি, আশঙ্কা, তারিফ পেরলে ভাললাগার স্ত্রী চারুবালা গুপ্তের চমৎকার সাক্ষাৎকারটি। ঘুড়ি, সাঁতার, ফুটবলপ্রেমী মানুষটি কখনও প্যাঁ–প্যাঁ করে বেহালা বাজিয়ে বউয়ের মান ভাঙান। আবার কখনও যেন বড় বেশি চাপা। আত্মসম্মানবোধে সচেতন। খ্যাপাটে জগদীশ গুপ্তকে এই অংশে পাঠক ভালবেসে ফেলেন। বাঁশি বাজানোর সময় গায়ে সাপ উঠলেও যিনি নির্বিকার, তিনি নির্মোহভাবে মহিমাহীন মানুষের গল্প লিখবেন এ আর নতুন কি!‌ সুমিত বড়ুয়ার আঁকা প্রচ্ছদের গোল চশমার আপাতনিরীহ লোকটির যে গভীর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের সুতো গোটাতে গোটাতে আমরা ব্যক্তিতে পৌঁছোই। যে–বৈপরীত্যের দ্বন্দ্বে তিনি জগদীশ, ঠিক সেই অশুভ–‌শুভ, পাপ–‌পুণ্যে কাতর তাঁর সাহিত্যের চরিত্ররাও। কখনও এরা চেষ্টিত, শ্লেষাত্মক। যেন অভিনয় করে চলেছে সুখের, দুখের। ভাল করাটাও ঠিক ভাল করা নয়, আবার মন্দটাও ঠিক মন্দ নয়। নিত্য প্রক্সি‌ দিয়ে চলেছে ‘‌অসাধু সিদ্ধার্থ’‌রা‌। দুই মহাযুদ্ধের মাঝখান ও কিছু পর লেখকের শ্রেষ্ঠ প্লটের সময়কাল। অথচ শৈলীতে প্লটের ঐক্য উধাও। হতে পারে অভিজ্ঞতার অসংলগ্নতা ইউরোপীয় অস্তিবাদী সাহিত্যিকদের বাক্‌রীতিকে যেমন প্রভাবিত করেছিল, তেমনই তাঁকে করেছিল উদাসীন। অর্থ–‌লালসা–‌ঈর্ষা–যৌনতা সব পাশাপাশি আছে অথচ তাতে দ্রোহ নেই, দাম্পত্য যেন ‘‌মধুমাখা ভ্রান্তি’‌ মাত্র। উজাগরে প্রকাশিত তাঁর বেশি কিছু চিঠিপত্র এবং মননশীল প্রবন্ধগুলি জগদীশ গুপ্তের জীবনদর্শন অনুসন্ধানী।
‘‌নেপথ্যের রজ্জু’‌, ‘‌লাঙ্গুলোপাখ্যান’‌, ‘‌স্বপ্ন যখন হঠাৎ সত্য হয়’‌, ‘‌গণনীয় নন্দকিশোর’‌–এর মতো অগ্রন্থিত গল্পগুলি পাঠক এখানে পেয়ে যাবেন। আবার বিবিধ দৃষ্টির আলোকে বহুপঠিত ‘‌পয়োমুখম্‌’,‌ ‘‌হাড়’‌, ‘‌পেয়িংগেস্ট’‌ গল্পগুলির পুনর্মূল্যায়ন সহজবোধ্য। জগদীশ গুপ্তের ছোটগল্পের কথনবিশ্ব বহুমাত্রিক। বাস্তবের অতিরিক্ত কিছু‌র ক্ষেত্রে কাকতালের ব্যবহার করছেন, পয়োমুখম্‌ গল্পে কৃষ্ণকান্তের অপরাধমনস্কতাকে সিরিয়াল কিলারের রহস্যে ধরছেন, মনের ভারসাম্যহীনতায় শরীরী হয়েছে ‘‌রসাভাস’‌, ‘‌শশাঙ্ক কবিরাজের স্ত্রী’‌র মতো গল্পগুলি‌। আবার মনও শরীরী হয়েছে ‘‌চিহ্ন’‌ গল্পে। এ–জগতে তিনি নির্মোহ জীবনবাদী।
সুবোধ ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, রমাপদ চৌধুরি, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের পর ‘‌উজাগর’‌ কল্লোলের মৌলিক স্বর জগদীশ গুপ্তের কথাসাহিত্যের পুনঃপ্রসঙ্গায়ন বা জীবনপঞ্জি–‌গ্রন্থপঞ্জি সমেত একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণামূলক কাজ করল। সম্পাদকের কথায়— ‘‌জগদীশ গুপ্তের কথাসাহিত্য কোনও আদর্শবাদের দ্বারা আচ্ছন্ন নয় বলেই তার প্রাসঙ্গিকতা কখনও ফুরায় না।’‌ গুরুদেবের স্বীকৃতি বা ব্যক্তিগত আক্রমণ দিয়ে যে সংখ্যার শুরু, কাকতলীয়ভাবে সংখ্যার শেষ প্রবন্ধটি চিনিয়ে দেয় স্বধর্মে অবিচল জগদীশকে, সেখানেও উপস্থিত রবীন্দ্রনাথ। কবিতা‌র ফর্মে, আটপৌরেভাবে। জগদীশ গুপ্তের লেখা অগ্রন্থিত ‘‌গুরুপ্রণাম’‌ কবিতাটি পাঠকের মূল্যবান প্রাপ্তি— ‘‌অনন্ত অতিথি আসে/‌তব রসসাগরের তীরে/‌আকণ্ঠ করিয়া পান/‌অবগাহি, তটহীন নীরে/‌মনোপাত্রে ভরি লয় সেই তীর্থবারি/‌লক্ষ নরনারী।’‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top