শম্পা ভট্টাচার্য: পবিত্র সরকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ। দুই বাংলার শিক্ষাচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সম্প্রতি তিনি জাপান সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ তৃতীয় নাগরিক সম্মান পেয়েছেন ‘‌অর্ডার অফ দ্য রাইজিং সান উইথ গোল্ড অ্যান্ড সিলভার রেইজ’‌। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহউপাচার্য, সাহিত্যিক, ভাষাবিদ, গবেষক এই অধ্যাপকের ২০১৮ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘‌ভাষাস্পর্শ’‌। এটি ভাষা প্রসঙ্গ নিয়ে নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক প্রবন্ধের সঙ্কলন। সহজ ভাষায়, সাবলীল স্টাইলে লেখা এই প্রবন্ধগুলিতে দৈনন্দিন জীবনে নানা উদাহরণ উপমা হিসেবে গৃহীত।
‘‌ভাষার জীবনমরণ’‌ এই বইটির অন্যতম আকর্ষণীয় প্রবন্ধ। ভাষার মরণ কত রকমের হতে পারে, পুনরুজ্জীবন সম্ভব কি না এ সব প্রসঙ্গের অবতারণা এখানে। আবার ‘‌বিদেশে (‌বা এদেশে)‌ বাঙালি শিশুদের বাংলা ভাষা শেখানো ও রক্ষা করা’‌ অধ্যায়ে লেখক ঘরোয়া শিক্ষায় কীভাবে মাতৃভাষা শেখানো যায় সে বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ইন্টারনেটের যুগে ইউটিউব বা ভিডিওতে বাংলা ভাষা শেখা যেতে পারে। বইপত্র তো আছেই। ইউটিউবে সিসিমপুর চ্যানেলে বাংলাদেশের দূরদর্শনের শিশুদের জন্য রচিত সাহিত্যভিত্তিক অনুষ্ঠান অনেক প্রবাসী শিশু দেখে থাকে। যদিও তা আমেরিকার দূরদর্শন অনুষ্ঠান Seaseme Street‌–‌এর আদলে করা। এমনকি এখন মিশিগানে ইস্ট লানসিঙে শিশুদের কিন্ডারগার্টেন স্কুলে নানা ভাষাভাষী শিশুদের মধ্যে বাংলা ভাষাভাষী থাকায় বাংলাতে নানা শব্দ ও ছবি দেখানো হয়। এভাবে ভাষা শেখানোর একটা প্রাথমিক প্রচেষ্টা থাকে। বানান সমস্যা জ্বলন্ত সমস্যা। দুই বাংলার বানানের সমতাবিধান নিয়ে প্রবন্ধ আছে এ গ্রন্থে। নৈঃশব্দ্যের ভাষা’ উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ। মানুষ যখন শোকে পাথর হয় তখন তারও আলাদা ভাষা থাকে। স্তব্ধতা শোককে প্রগাঢ় করে। নিঃশব্দের তর্জনী উপেক্ষণীয় নয়। লেখকের মতে, প্রভুত্বের শোষণ কিংবা চোখরাঙানির হিমশীতল নৈঃশব্দ্যের চাপও বড় কম নয়। ইউরোপ ভ্রমণের সময়ে অভিনেত্রী সারা বার্নহাডের সঙ্গে পরিচিত হন বিবেকানন্দ। অভিনেত্রী যেমন‌ সুন্দরী, তেমনই মোহময়ী তাঁর হাসি। বিবেকানন্দকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘‌অভিনেত্রীর বিখ্যাত হাসি কি আপনি শুনেছেন?‌ বিবেকানন্দের জবাব, ‘‌না। She heard my silence‌’‌। অনুবাদের নানা প্রয়োজনীয় সূত্রের কথা আছে ‘‌অনুবাদ সমস্যা ও ভারতীয় ভাষা’‌ প্রবন্ধে। ‘‌কলকাতার ভাষা’‌ সম্পর্কে আলোচনায় লেখক সময়ের সঙ্গে, অঞ্চল ভেদে ভাষার প্যাটার্নের যে অনেক তারতম্য হয়েছে সে কথা স্মরণ করেছেন। ২১ ফেব্রুয়ারি বা ১৯ মে–‌র ভাষা স্মরণ দিবস যেন ভাষাপুজোর দিনে পরিণত না হয় তার জন্য সচেতন হওয়া দরকার বলে লেখক মনে করেন।
ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে আমজনতার কৌতূহল ছিল কম। অপরিচয়ের প্রাচীর ছিল সুউচ্চ। লেখক দীর্ঘকাল ধরে সাবলীল ভাষায় লেখালেখি আর আলাপ আলোচনায় সেই অপরিচয়ের অদৃশ্য প্রাচীরটিকে খাটো করেছেন এ কথা অনস্বীকার্য। ‘‌ভাষাস্পর্শ’‌ করেননি লেখক। ভাষাতে অন্তর্গত হয়েছে তাঁর মন ও মনন। লেখকের অন্যান্য বইয়ের বিস্তৃত তালিকা আছে গ্রন্থের শেষ পর্যায়ে। আলোচ্য প্রবন্ধে লেখালেখিগুলি কোন কোন পত্রিকায় প্রকাশিত তার উল্লেখ থাকলে পাঠকের আরও নানা কৌতূহল নিরসন হত। ■
ভাষাস্পর্শ • পবিত্র সরকার • সাহিত্যলোক • ৩২০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top