অবন্তিকা পাল: ‌ধরা যাক একটি মস্ত বটবৃক্ষতলে বসে এক প্রৌঢ় কথক তাঁর দেশের মানুষের গল্প বলছেন। গাছের সামনে বসে শুনছে অগণিত কৌতূহলী চোখ। এ গাথাগুলি কথকের স্বরচিত নয়, বরং সুপ্রাচীন ও বহুশ্রুত। তথাপি নিত্যনতুন ভাবের আধারে সদাপ্রাণোচ্ছল। এ গল্পগুলি গানের। পল্লিগানের। প্রাচীন বাংলাদেশের বৃহদংশ জুড়ে দণ্ডায়মান মৈমনসিংহ— যার উত্তরে গারো, জয়ন্তী, খাসিয়া পর্বত, দক্ষিণপূর্বে ধনু, ফুলেশ্বরী, রামেশ্বরী, সুন্ধা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্রের কলরোল। এই গাথামালায় দেবভাষায় লেখায় কাব্যের মণিমাণিক্য নেই। বরং উপেক্ষিত মানুষের খড়কুটোকে সম্বল করে এ গল্পগুলি ভেসে যায় অনির্দিষ্ট স্রোতে। কেননা, এই কথামালা মৈমনসিংহ গীতিকারত্নের। এবং, বটবৃক্ষের নিচে বসে থাকা গীতিকথকের নাম এক্ষণে দীপ্ত দাশগুপ্ত। 
ইতিহাসে জানা যায়, ১৯১৬ সালে। মৈমনসিংহের কবি চন্দ্রকুমার দে প্রথম এলাকার প্রচলিত পালাগুলি সংগ্রহ করে এনেছিলেন। আচার্য দীনেশচন্দ্র সেনের উৎসাহে তা ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। এই সমস্ত পালা 'মৈমনসিংহ গীতিকা' নামেই সুপরিচিতি। মৈমনসিংহ গীতিকাগুলিতে হিন্দু ও মুসলমান দুটি সংস্কৃতিই সমানভাবে দেখতে পাওয়া যায়। তবে এদের স্বাতন্ত্র্য এই যে— এই গাথাগুলির উপর ধর্মের প্রভাব খুবই অল্প। এদের অধিকাংশই প্রণয়াশ্রিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘বাংলা প্রাচীন সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য প্রভৃতি কাব্যগুলি ধনীদের ফরমাসে ও খরচে খনন করা পুষ্করিণী; কিন্তু ময়মনসিংহ গীতিকা পল্লী হৃদয়ের গভীর স্তর থেকে স্বতঃ উচ্ছ্বসিত উৎস, অকৃত্রিম বেদনার স্বচ্ছ ধারা। বাংলা সাহিত্যে এমন আত্ম-বিস্মৃত রসসৃষ্টি আর কখনো হয়নি।’
মৈমনসিংহ গীতিকায় দশটি গীতি স্থান পেয়েছে, যথা— মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী, কমলা, দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারামের পালা, রূপবতী, কঙ্ক ও লীলা, কাজলরেখা ও দেওয়ানা মদিনা। ভণিতা থেকে কিছু গীত রচয়িতার নাম জানা যায়, বাকিগুলি প্রচলিত। পুরুষ চরিত্রের তুলনায় নারী চরিত্রের ভূমিকা উজ্জ্বল। নারীদের একনিষ্ঠ প্রেম ও বলিষ্ঠ চরিত্র থেকে অনেকে মনে করেন গীতিকাগুলিতে কোনও মাতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রভাব থাকতে পারে। এই গীতিকাগুলির মধ্যেই আমরা পেয়েছি ষোড়শ শতকের প্রথম বাঙালি মহিলা কবি চন্দ্রাবতীকে, যাঁর নিজের জীবনই কিংবদন্তি হয়ে ‘চন্দ্রাবতী’ পালায় পর্যবসিত হয়েছে।
প্রতিটি গীতের স্বতন্ত্র কাহিনি রয়েছে, লেখক দীপ্ত দাশগুপ্ত যা সুচারুভাবে আখ্যায়িত করেছেন তাঁর ‘মৈমনসিংহের গীতিকারত্নে— গাঁথা গল্প’ গ্রন্থে৷ গল্পের ভাষা গল্পের মতোই সরল ও সুখপাঠ্য। মুখবন্ধে অযাচিত তথ্যের আধিক্য নেই। সমগ্র বইয়েও কোনও শব্দ ও অলঙ্কারের গুরুভার নেই। পাঠের পর কেবলই সুখদুঃখানুভূতি পাঠককে ভালোবাসার গল্পে সিক্ত করে রাখে বহুক্ষণ। ■
মৈমনসিংহের গীতিকারত্নে-গাঁথা গল্প ‌• দীপ্ত দাশগুপ্ত
ধানসিড়ি • ২৫০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top