সন্দীপ চট্টোপাধ্যায়: ‘বিদ্যাসাগর’ তাঁর উপাধি। পিতামহপ্রদত্ত নাম ঈশ্বরচন্দ্র। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র অপেক্ষা বিদ্যাসাগর নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। এতটাই পরিচিত যে, তাঁরও ৩৩৭ বছর আগে দেশে প্রথম ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে চৈতন্যদেব ভূষিত হলেও; কিংবা রামগতি ন্যায়রত্নের কথা অনুসারে আরও অনেকেই ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করলেও ‘বিদ্যাসাগর’ বলতে শুধু বীরসিংহের নরসিংহ ঈশ্বরচন্দ্রকেই মানুষ চেনেন। আবার ‘প্রাতঃস্মরণীয়’ শব্দটিও সশ্রদ্ধায় শুধুমাত্র তাঁরই নামের আগে উচ্চারিত হয়। পাণ্ডিত্যে, শিক্ষকসত্তায়, সমাজসংস্কারে, জনশিক্ষা প্রসারে, নারীশিক্ষার পথ তৈরিতে, বয়স্কদের জন্য নৈশবিদ্যালয় স্থাপনে, শিশুদের জন্য পাঠ্যপুস্তক রচনায়, পুস্তক প্রকাশনা এবং বিক্রয় কর্মে, জাতপাত এবং ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে, দরিদ্র–অসহায় মানুষের প্রতি ভালবাসায় এবং সর্বোপরি জনহিতকর কর্মে একলা পথের পথিক হয়েও যিনি ‘প্রতিজ্ঞায় পরশুরাম’ তিনি যে আজও সমান প্রাসঙ্গিক এবং সমান প্রয়োজনীয় তা বোঝা যায় তাঁকে নিয়ে মানুষের আগ্রহে এবং উৎসাহে। তাঁর জন্মের দ্বিশতবর্ষ আগতপ্রায়। 
২০২০–র ২৬ সেপ্টেম্বর আমাদের সামনে সুযোগ আসতে চলেছে তাঁর চিন্তা, কর্ম, ত্যাগ এবং আদর্শকে মানুষের মাঝে আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়ার। সেই কর্মে ইতিমধ্যেই অগ্রণী হয়ে ধন্যবাদার্হ হয়েছে ‘সূত্রধর’ প্রকাশিত সুমন ভৌমিক সঙ্কলিত ‘বিদ্যাসাগর: স্মরণ–বরণ’ এবং উৎপল ভট্টাচার্য সম্পাদিত কবিতীর্থ পত্রিকার ‘‌ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’‌ সংখ্যা।
‘সূত্রধর’ প্রকাশিত ‘বিদ্যাসাগর: স্মরণ–বরণ’ বিভিন্ন সূত্র থেকে লব্ধ ‘অপূর্ব রেখায় চিত্রিত বিদ্যাসাগরের জীবন আর ব্যক্তিত্ব’ সম্পর্কিত একটি মূল্যবান সঙ্কলন। সঙ্কলনটি যে–সমস্ত কারণে মূল্যবান তার অন্যতম হল, যাঁদের রচনা এখানে সন্নিবেশিত হয়েছে, তাঁরা সকলেই বিদ্যাসাগরের জীবৎকালে জন্মেছিলেন।
এমনকী, কেউ কেউ আবার বিদ্যাসাগরের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যও লাভ করেছিলেন। ‘সুপরিচিত হলেও চিরস্মরণীয় রচনাগুলির একত্র সন্নিবেশ’ সঙ্কলনটির গুরুত্বকে বহুগুণিত করেছে। ‘নান্দীপাঠ’ করা হয়েছে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা দিয়ে।
আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, শিবনাথ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রমেশচন্দ্র দত্ত, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘‌তিনি যথার্থ মানুষ ছিলেন’‌ বলেই মানবকল্যাণে, সমাজসংস্কারে, শিক্ষার প্রসারে বিদ্যাসাগর নিজেকে উজাড় করে দিতে পেরেছিলেন।
উন্নত মানের কাগজে, নির্ভুল বানানে, সুন্দর প্রচ্ছদে, রুচিশীল পারিপাট্যে ‘সূত্রধর’–এর এই শ্রদ্ধার্ঘ্য বিদ্যাসাগরের মতো মনীষার প্রতি সার্থক ঋণ স্বীকার।
‘‌বাঙালির বাল্যশিক্ষার আলো।

শৈশবের চরিত্র গঠনের নিধি; এক চলমান গৌরবময় আলোকস্তম্ভ’‌ স্বরূপ যে বিদ্যাসাগর, জন্মের দ্বিশতবর্ষের প্রাক্কালে তাঁকে নিয়েই উৎপল ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘কবিতীর্থ’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার পরিকল্পনা। 
সংখ্যাটি সেকাল এবং একালের চিন্তকদের অনুভূতি–উপলব্ধি এবং বিশ্লেষণের এক অনন্য সম্ভার। লেখকসূচীতে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শিবনারায়ণ রায়,  অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতো মহারথীরা।
শিবনারায়ণ রায়ের কথায়, বিদ্যাসাগরকে ‘‌পরম্পরা শাসিত প্রথানুগত এবং চিন্তার ক্ষেত্রে প্রায় মৃতবৎ সমাজের সংস্কারের উদ্দেশ্যে এককভাবে আন্দোলনে নামতে হয়েছিল।’‌ সাগরে থাকা অগ্নির মতো ‘‌এমন একজন মানুষকে নিয়ে যে কোনও দেশই গৌরব বোধ করতে পারে’‌— তপসী অধিকারীর অনুবাদে এ কথা জানিয়েছেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদানের কথা উচ্চকণ্ঠে স্বীকার করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ— ‘‌বঙ্গসাহিত্যে আমার কৃতিত্ব দেশের লোকে যদি স্বীকার করে থাকেন তবে আমি যেন স্বীকার করি একদা তার দ্বার উদ্ঘাটন করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।’‌ রবীন্দ্রনাথের এই কথারই অনুরণন শোনা যাবে অন্নদাশঙ্করের লেখায়— ‘‌সাহিত্যে তাঁর স্থান স্রষ্টা হিসাবে নয়, দ্রষ্টা হিসাবে নয়, পাইওনীয়ার হিসাবে।’ অনুপম মুখোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যাবে, প্রথম দিকে প্রবল বিদ্যাসাগর–বিরোধিতা সত্ত্বেও বঙ্কিমচন্দ্রের সেই স্বীকারোক্তি— ‘‌বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভাষা অতি সুমধুর ও মনোহর। তাঁহার পূর্বে কেহই এরূপ সুমধুর বাঙ্গালা গদ্য লিখিতে পারে নাই, এবং তাঁহার পরেও কেহ পারে নাই।’‌
সুরজিৎ দাশগুপ্তের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ‘‌রবীন্দ্রনাথই ঈশ্বরচন্দ্রের প্রকৃত ভাবশিষ্য।’
আমরা কোন কোন ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের উত্তরাধিকার বহন করছি, আর কোন কোন ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার হারিয়েছি, তার বিস্তৃত পরিচয় তুলে ধরেছেন সুমিতা চক্রবর্তী।
‘‌একুশ শতকের প্রথম সতেরো বছর পেরিয়ে এসেও ধর্মোন্মাদনার হিংস্র অন্ধকার মোকাবিলায়’‌ বিদ্যাসাগরের চিন্তাধারাকে কাজে লাগানো প্রসঙ্গে তপোধীর ভট্টাচার্যের লেখাটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষক সম্পর্কে ‘শিক্ষক’ বিদ্যাসাগরের উপলব্ধির কথা জানা যাবে শিবনারায়ণ রায়ের ‘ব্যতিক্রমী এক চরিত্র’ থেকে। বিদ্যাসাগরের মতে, শিক্ষকের অন্যতম গুণাবলি হল— ‘‌ক্লান্তিহীন কঠোর পরিশ্রম, প্রবল উৎসাহ, অসীম ধৈর্য্য এবং জ্ঞান ও সমাজের মঙ্গলের জন্য জীবন উৎসর্গ করা।’‌ চণ্ডী মুখোপাধ্যায়ের ভিন্ন স্বাদের লেখা ‘বাংলা চলচ্চিত্রে বিদ্যাসাগর’।  
‘ঘটনাপঞ্জির আলোকে বিদ্যাসাগর’ এবং ‘বিদ্যাসাগরের রচনাপঞ্জি: রচিত–সম্পাদিত’ অংশ দুটির গুরুত্বও অপরিসীম।
সব মিলিয়ে তথ্যে এবং বিশ্লেষণে পরিপূর্ণ বিদ্যাসাগরকে জানার অপরিহার্য সংখ্যা ‘কবিতীর্থ’। ■
 

জনপ্রিয়

Back To Top