দেবাশিস দত্ত: মনসুর আলি খান পতৌদি, চেষ্টা করেও খুঁজে পাচ্ছিলেন না তেমন ভাল জোরে বোলার। তাই, বাধ্য হয়েই স্পিন বোলারদের দিকে ঝুঁকতে হয়েছিল তাঁকে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পাওয়ার পর। দুনিয়া দেখল, ভারতীয় স্পিন বোলারদের ইন্দ্রজাল। অনবদ্য রান আপ, চমৎকার অ্যাকশন এবং বলে পাক ধরিয়ে ব্যাটসম্যানদের সামনে ফাঁদ তৈরি করে আউট করে দেওয়ার পালা চলছিল বিশ্বজুড়ে। রনজি সিংজির বিখ্যাত লেট কাটের মতোই ভারতীয় স্পিনাররা তখন গোটা পৃথিবীতে ভেলকি দেখিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। 
শুরু করেছিলেন পালওয়ানকার বাবু। সেটা ১৮৭৫ সালের কথা। তখন ভারত, বিশ্ব ক্রিকেটে নেহাতই শিশু। ইংরেজদের দেখানো পথে ভারতীয়রা সবে ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছিলেন। এভাবেই গোয়ার চর্মকার পরিবার থেকে উঠে আসা বোলার পালওয়ানকার হঠাৎই বড় স্পিনার হয়ে উঠলেন। কীভাবে?‌ তা জানার জন্য অনিন্দ্য দত্তর উইজার্ডস বইটিতে চোখ বোলাতে হবে। তারপর একে একে উঠে এসেছিলেন সুভাষ গুপ্তের মতো অসাধারণ লেগ স্পিনার। পরবর্তী অধ্যায়ে বাপু নাদকার্নি, চাঁদু বোরদে, সেলিম দুরানিরা। এঁদের সময়ের শেষ দিকে চলে এসেছিলেন অধিনায়ক মনসুর পতৌদি এবং তিনি এসেই বেদি, প্রসন্ন, চন্দ্রশেখর, বেঙ্কটরাঘবনদের হাতে প্রায় নতুন বল তুলে দিয়েছিলেন। চার রকম বৈচিত্র‌্য নিয়ে আসতেন এই চার বিখ্যাত স্পিনার (‌এই যুগেই পদ্মকার শিভলকার, রাজিন্দর গোয়েলরা উপেক্ষিত থেকে গেলেন)‌।
পরের দিকে শিবলাল যাদব, দিলীপ দোশি, রবি শাস্ত্রী, মণিন্দর সিং, লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণন, নরেন্দ্র হিরওয়ানি, অনিল কুম্বলে, হরভজন সিং, রাজেশ চৌহান, বেঙ্কটপতি রাজুরা বল ঘোরাতে লাগলেন। এখন যেমন অশ্বিন জমানা চলছে, তেমনই এক সময় স্পিনারদের দাপটে ভারত কখনও ইংল্যান্ড, কখনও নিউজিল্যান্ড, কখনও অস্ট্রেলিয়া, কখনও ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে জিতে ফিরছিলেন। পশ্চিম তখন ভাবত, ভারত মানেই যেন ইন্দ্রজালের দেশ। তেমনি ভারতীয় ক্রিকেট মানেই স্পিনারদের রমরমা। সেই ট্র‌্যাডিশন এখনও চলছে। চলতি দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে মহম্মদ সামি, ইশান্ত শর্মাদের দাপট থাকলেও অশ্বিন, জাদেজাদের উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ স্পিন বোলিংয়ের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে রাখতেই হচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেট দলকে।
এই বইয়ে লেখক অনিন্দ্য আদ্যিকাল থেকে এই ২০১৯ পর্যন্ত যেসব ভারতীয় স্পিনার ভেলকি দেখিয়ে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়ে এসেছেন বছরের পর বছর, তাঁদের উঠে আসার গল্প, লড়াই, সাফল্য, ইতিহাস— সব তুলে এনেছেন নিপুণভাবে। সঙ্গে বুদ্ধি করে মিশিয়েছেন গল্প, নানা ম্যাচের রঙিন মুহূর্তও। কীভাবে স্পিনারদের দাপটে ছত্রখান হয়ে গিয়েছে বিপক্ষ দলগুলো, সেগুলোর নিখুঁত বর্ণনাও রয়েছে এই বইতে। নিজের বাড়ির ক্রিকেট লাইব্রেরিতে এই বই রাখা মানে ভারতীয় স্পিন বোলিংয়ের যাবতীয় তথ্য আপনার ড্রইং রুমে মজুত হয়ে যাওয়া। 
ভূমিকা লিখেছেন কপিলদেব। স্পিনারদের ভিড়ে জোরে বোলারকে দিয়ে ভূমিকা লেখানোটা একটা ব্যাপার বটে। কপিল লিখেছেন, ১৯৭৮ সালে পাকিস্তান সফরে অভিষেক হওয়ার সময় ছিল স্পিনারদেরই দাপট। বেদি, প্রসন্ন, চন্দ্রশেখর, বেঙ্কটদের সঙ্গে খেলতে হয়েছিল তাঁকেও। এঁদের প্রত্যেকের সম্পর্কে নিজের মতামত জানিয়েছেন কপিলদেব। গল্পগুলো চমৎকার, যা রয়েছে গোটা বইজুড়ে। লেখকের অজস্র পরিশ্রম করার ছাপ রয়েছে প্রতি পাতায়। এ কারণেই, অবশ্য পাঠ্যের তালিকায় ঢুকে পড়বে অনিন্দ্যর এই বই। ■
উইজার্ডস ● অনিন্দ্য দত্ত ●‌ ওয়েস্টল্যান্ড পাবলিকেশনস ●‌ ৫৯৯ টাকা‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top