সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ‘.‌.‌.‌সকালবেলায় এল টেলিফোনের ডাক, ও–প্রান্ত থেকে একজন ঈষৎ রুষ্টভাবে প্রশ্ন করছেন:‌ ‘‌কাল যে–বইটি প্রকাশ করলেন সেটা যে দেবীপ্রসাদের লেখা নয়, লেখা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের, সেটা কি জানেন আপনি?‌’‌
টেলিফোনটির গ্রাহক, যিনি আগের সন্ধের উদ্বোধকও, তাঁর নাম শঙ্খ ঘোষ। তিনিই স্বয়ং এক লেখায় সম্প্রতি জানিয়েছেন এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ার মতো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হাওয়ার কথা। শারদ সংখ্যা অনুষ্টু্প’‌ পত্রে। ‘বই প্রকাশের দুর্ঘট’‌ শিরোনামে।
মজার কথা, এই ‘‌দুর্ঘট’‌ বা দুর্ঘটনাটি ঘটে ‘‌অনুষ্টুপ’‌ আয়োজিত এক স্মারকবক্তৃতা তথা বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানে। আর দুটো ব্যাপারই ছিল বিশিষ্ট দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচিহ্নিত। শঙ্খবাবু লিখেছেন, ওই ফোনসূত্রেই তাঁর মনে পড়ে আরেক বিড়াম্বনাময় স্মৃতির কথা। দিল্লিতে রবীন্দ্রনাথের জন্মের দেড়শো বছরে সমগ্র চিত্রাবলীর উন্মোচনের দিনের কথা। সেখানেও এক বড় কেলেঙ্কারি ঘটেছিল। এ ‌লেখা পড়তে পড়তে চমকে উঠতে হয়, পড়ার পরে ঋদ্ধও হওয়া যায়। বাকিটা লেখা পড়ে জানাই ভাল।
বরাবরের মতোই এবারের শারদসংখ্যা ‘‌অনুষ্টুপ’–এরও মূল আকর্ষণ প্রবন্ধ, শিরোভাগে অরিন্দম চক্রবর্তী, দীপেশ চক্রবর্তী, মৈত্রীশ ঘটক, প্রণব বর্ধন, স্বপন চক্রবর্তীর মতো তারকাদ্যুতিসম্পন্ন প্রাবন্ধিকেরা তো আছেনই দর্শন–সংস্কৃতি–রাজনীতি–অর্থনীতি–শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে ধূমায়িত তর্ক সহযোগে। পাশাপাশি ‘‌রবীন্দ্রনাথ’‌ বিষয়ক ক্রোড়পত্রটিও তৃপ্তি দিয়েছে। এটি মোটেই পুরনো জানা বিষয়ের চর্বিত চর্বণ হয়ে ওঠেনি। ‘আইয়ুবের রবীন্দ্রচর্চা’ প্রবন্ধে আইয়ুবের জেন্ডার চয়েস–এর ব্যাপারটা এসে অন্য মাত্রা তৈরি করেছে। সাহসী এই প্রবন্ধটি লিখেছেন তপোব্রত ঘোষ। সন্দীপন সেনের প্রবন্ধে ঠাকুরবাড়ির বিষয়–আশয়, মামলা–মোকদ্দমার প্রশ্নে নানা ‘‌কেচ্ছা’‌ ও সে বৃত্তান্তে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান বিশ্লেষণ আর একটি তথ্যসমৃদ্ধ, সাহসী  লেখা, রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের ‘বঙ্কিম প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ’ও সংক্ষিপ্ত হলেও ভাবনা–উদ্রেককারী লেখা। অন্য ক্রোড়পত্রটির বিষয় বিজ্ঞান। যথারীতি সেটিও সমৃদ্ধ।
উৎপল দত্ত তাঁর নাটকে ইতিহাসকে নিজের ব্যাখ্যা মতো বিনির্মাণ করে নিয়েছেন এবং তা করেছেন একটি বিশেষ সময়ের দাবি মেনে — এই সন্দর্ভ উঠে এসেছে মলয় রক্ষিতের লেখায়। মন্তব্যটি বিতর্কযোগ্য, কিন্তু মলয় নিজের যুক্তি–স্থাপনে পরিশ্রমী থেকেছেন। একইরকম পরিশ্রমী, বিশ্লেষণ, লেখা প্রসাদ সেনগুপ্তের ‘‌অক্ষয়–মানস’‌, মহাভারতের শান্তিপর্বের ছোট ছোট উপকাহিনী দিয়ে আজকের জীবনের নানা সংকট মুহূর্তকে বিচার করে দেখার চেষ্টা করেছেন দেবীদাস আচার্য। ‘‌বিপন্ন সময়ের ধর্ম’‌ লেখায়।
হাংরি জেনারেশনের বিস্মৃত–প্রায় গল্পকার আবনী ধরকে নানাজনের স্মৃতিকথায় আর সঙ্কলনে তাঁর সাতটি গল্পে ধরার চেষ্টাটাও দারুণ, সর্বোপরি রণজিৎ গুহ আর পার্থ চট্টোপাধ্যায়— দুই সমাজতত্ত্ববিদের মুখোমুখি হওয়ার চল্লিশটি পাতাও বড় পাওনা এ সংখ্যায়। প্রায় নশো পাতার এ সংখ্যার ভারই শুধু নয়, ধারও কিন্তু প্রবল। ■
অনুষ্টুপ, শারদীয়া সংখ্যা • সম্পাদনা:‌ অনিল আচার্য ৪৫০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top