ঋত্বিক মল্লিক: ফেলুদা কি কখনও ভেবেছিলেন যে, ভবিষ্যতে আরেক গোয়েন্দা তাঁর উপর গোয়েন্দাগিরি করবেন?‌ ফেলুদার যাবতীয় গল্প থেকে নানা সূত্র জুড়ে নিয়ে আতশ কাচের তলায় ফেলবেন ফেলুদার জীবন?‌ শুধু ফেলুদা নয়, তোপসে–‌জটায়ু, সিধু জ্যাঠা–‌পুলিশরা–‌খলনায়করা— কেউই নিস্তার পায়নি এই ভবিষ্যতের গোয়েন্দার হাত থেকে। বিদেশে, সাহিত্যের গোয়েন্দাদের নিয়ে, বিশেষত শার্লক হোমসকে রক্তমাংসের বাস্তব মানুষ হিসেবে ধরে নিয়ে চরিত্র নির্মাণ করেছেন উইলিয়ম বেরিং গোউল্ড। বাংলায় সেইরকম কাজ করলেন প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত, তাঁর ‘‌ফেলুদা রহস্য’‌ বইয়ে।
এক জটিল সূত্রাবলি থেকে প্রসেনজিৎবাবু নির্ণয় করেছেন যে ফেলুদার জন্মসাল ১৯৩৮, সুতরাং এখন তাঁর বয়স আশি। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এসে তিনি শেষ কাজ করেছেন। তারপর এতগুলি বছর ফেলুদাকে অপেক্ষা করতে হল তাঁর একটা ‘‌প্রামাণ্য’‌ জীবনী রচনার জন্য।
জীবনী বইয়ে যা থাকে, অর্থাৎ ‘‌জন্মদিন’‌, ‘‌পরিচয়’‌, ‘‌চেহারা’‌র বর্ণনা, ‘‌শখ, স্বভাব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য’‌, ‘‌কর্মজীবন ও খ্যাতি’‌, ‘‌রোজগার’‌, বাজিঘরের কথা, ভোগবাদে বিশ্বাস করেন কিনা ইত্যাদি একে একে এসেছে প্রসঙ্গ সূত্রে। মাঝেমধ্যে গোয়েন্দা প্রসেনজিতের নজর পড়েছে কিছু তথ্যের গোলমালের ওপর। তোপসের লেখা বলে গল্পগুলো পরিচিত হলেও, যেহেতু আসলে তা সত্যজিৎ রায়ের লেখা এবং আমরা সবাই জানি যে খুঁটিনাটি সব বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি ছিল প্রখর। তাই সত্যজিৎ রায়ের লেখা থেকে অসঙ্গতি খুঁজে বার করা সাধারণ গোয়েন্দার কাজ নয়।
প্রসেনজিৎ ফেলুদা অ্যান্ড কোম্পানিকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চর্চা করছেন। শুধু ফেলুদা নয়, সাহিত্যের গোয়েন্দাদের নিয়ে তিনি লিখে ফেলেছেন একের পর এক বই। সুতরাং ‘‌ফেলুদা রহস্য’‌ বইটি কোনও বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা নয়, ধারাবাহিক চর্চার একটি নিদর্শন।
‘‌ফেলুদা রহস্য’‌ বইয়ের অধ্যায় সংখ্যা ৪৫। ফেলুদার জন্য ব্যয় করা হয়েছে ১৩টি অধ্যায়। এছাড়াও অন্যান্য চরিত্রের জন্য ১১টি অধ্যায় এবং বিবিধ প্রসঙ্গের জন্য রয়েছে ২১টি অধ্যায়। এই হিসেব থেকে পাঠক নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছেন যে সামগ্রিক আয়োজনটি কতটা বিস্তারিত।
লেখকের মুনশিয়ানার সঙ্গে যোগ দিয়েছে ৯ঋকাল বুকসও। বইয়ের যাবতীয় অলঙ্করণ এবং প্রচ্ছদে ব্যবহৃত ছবিগুলো নেওয়া হয়েছে সত্যজিৎ রায়ের কাজ থেকে। সায়ন্তন মৈত্রকে (‌শিল্পনির্দেশক)‌ প্রশংসা করতেই হয়। সামগ্রিকভাবেই বইটি সুন্দর।
শেষে একটি অধ্যায় নিয়ে কয়েকটা কথা বলতেই হবে। অধ্যায়টির নাম ‘‌সিস্টেমটা দিশি না বিলিতি’‌। ফেলুদার গল্পকে রেখে প্রসেনজিৎ পরিক্রমণ করেন গোয়েন্দাবিশ্ব। আর্মচেয়ার ডিটেকটিভ আর হার্ডবয়েলড ডিটেকটিভের ফারাক বোঝাতে উঠে আসে শার্লক হোমস, এরকুল পোয়ারো, শ্যাম স্পেড, ফিলিপ মার্লোর কথা। প্রসঙ্গত এসেছে ব্যোমকেশ বক্সির। কিন্তু ফেলুদার ধরন এঁদের কারও সঙ্গেই সম্পূর্ণ মেলে না। এক নিজস্ব পদ্ধতিতে তিনি চলেন। ক্রাইমের ধাঁচ অনুযায়ী তাঁর পদ্ধতি বদলায়। এই অধ্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ শুধু এই কারণে নয় যে, ফেলুদার ডিটেকশন নিয়ে তিনি গভীর বিশ্লেষণ করেছেন এবং তুলনা করেছেন সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভদের সঙ্গে, এমনকী যাঁরা গোয়েন্দা গল্প নিয়ে চর্চা করতে আগ্রহী হবেন, তাঁদের কাছে এই অধ্যায়টি হবে প্রাইমারের মতো। ছোট পরিসরে চমৎকারভাবে তিনি গোয়েন্দা গল্পের নানা দিক ছুঁয়ে গেছেন।
অনেক কিছু এই বইয়ে আছে, তবু যদি কোনও নির্যাস আপনাদের সামনে রাখতে হয়, তাহলে আমি উদ্ধৃত করতে চাইব এই কথাগুলি:‌
‘‌এত কিছুর পরেও কিন্তু এই গোয়েন্দাপ্রবর পাঠকের কাছে থেকে যায় প্রদোষচন্দ্র মিত্র বা পি.‌সি.‌ মিটার, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর হয়ে নয়, এক এবং অদ্বিতীয় ফেলুদা হয়ে। কারণ ও যে আদতে তোপসের স্নেহশীল দাদা। আদর, প্রশ্রয়, ধমক–‌ধামক, নানারকম সাধারণজ্ঞানের পাঠ, সঠিক পথে চলার দিশা, তোপসের সঙ্গে সঙ্গে পাঠক নিজেও আহরণ করে ফেলুর কাছ থেকে। একটা বড় ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে ফেলুদা। তোপসের নয়। সকলের। ■
ফেলুদা রহস্য • প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত • ৯ঋকাল বুকস • ৫০০ টাকা‌

জনপ্রিয়

Back To Top