অলক চট্টোপাধ্যায়

 

রসনাস্মৃতির বাসনাদেশ (‌প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)‌ • সম্পাদনা সামরান হুদা ও দামু মুখোপাধ্যায় • ৯ঋকাল বুকস • প্রতিটি খণ্ড ৬০০ টাকা
স্মৃতিচ্ছবি যেমন চরিত্রে–‌মেজাজে নানারঙের, ছবিগুলির প্রদর্শনী বা পরিবেশনের ভঙ্গিও যথারীতি বৈচিত্র্যদীপ্ত। সুখ–‌দুঃখের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নিজস্ব পৃথিবীর বিবরণ চিরকালই অন্য এক স্বরলিপির সন্ধান দেয়। খুব কাছে ডেকে সত্যি রূপকথা শোনানোর স্টাইলে সম্পাদকদ্বয় নির্ভুল চিন্তায় যা বলেছেন (‌‘‌.‌.‌.‌ নতুন করে বুনতে চাওয়া ইতিহাসের তর্জমা, উদ্বাস্তু স্বপ্ন–‌স্মৃতি পুনর্বাসন প্রকল্প— রসনাস্মৃতির বাসনা দেশ। এ আসলে ঘরে ফেরার গান।’)‌‌‌ তা কৃতজ্ঞচিত্তে মেনে নেবেন রসিক পাঠকবৃন্দ। এবং সেই স্বীকৃতির প্রধান কারণ, এমন সুযোগ এর আগে বোধহয় কখনও মেলেনি। এই সঙ্কলন শুধুই বৈচিত্র্যপ্রিয় খাদ্যরসিকের জন্য নির্ধারিত নয়, বিস্তৃত অর্থে জীবনরসিকেরাও এখানে ‌অন্য পথের সন্ধান খুঁজে পাবেন ‘‌প্রেমতলা অশ্বত্থ গাছের বিশাল ছায়া’‌ বা ‘‌কীর্তনখোলা নদীর ঝাউবন ঘেরা স্টিমার ঘাট’‌–‌এ পৌঁছে দেয়।
বাস্তবিক বিচারে প্রতিটি সংগ্রহ ও সংরক্ষণযোগ্য বইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ প্রান্তে থাকেন সহৃদয়, রসসিক্ত পাঠকবৃন্দ। অন্যদিকে, দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের অন্তহীন যুদ্ধে সতত ক্ষত‌বিক্ষত হতে থাকেন একক আলোচক। মুগ্ধহৃদয়ের অনুচ্চারিত উল্লাস কী করে সংক্ষেপে প্রকাশ করা সম্ভব হতে পারে!‌ সেই লগ্নে মস্তিষ্কে প্রধান বিপদ হিসেবে উপস্থিত হয় উদ্ধৃতি নির্বাচন। হৃদয় ভাসিয়ে দেওয়া রচনাগুলোর মধ্যে একাধিক ক্ষেত্রে স্মৃতি ও জীবনের নানা ছবি নিয়ে দুরন্ত বালকদের ছুটোছুটি যেন। তবে নির্বিরোধী সত্য হিসেবে জানানো যায়, যাঁরা একদা অবিভক্ত বাংলার পূর্বদিকে থাকতেন, বেঁচে থাকার যাত্রাপথে কয়েকটা কুড়ি কুড়ি বছরও পার করতে পেরেছেন, তাঁদের কাছে এই সঙ্কলনগ্রন্থদ্বয় অধিকতর আদরণীয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
রসনাস্মৃতি যখন, তখন তো নানা চেহারায় তেনাদের আবির্ভাব হইবই। সঙ্গে আছে ভৌগোলিক অঞ্চলের উল্লেখ, যা সারেঙ্গির মতো হৃদয়হরণ সুরে সঙ্গে সঙ্গে বাজে। লেখক বরিশালের মানুষ না হলে কী করে আর বিস্ময়কর মৎস্যস্মৃতি উঁকি দেয়!‌ তো তাঁর অক্ষরজ্ঞানশূন্য বন্ধু (‌‘‌মুচুকুন্দ পাথর’‌)‌ অনায়াসে প্রায় একশো রকমের মাছের নাম বলতেন। যার শুরু চন্দন ইলিশ, পদ্ম ইলিশ, গুর্তা ইলিশ এবং বাকি থাকে আরও প্রায় সাতানব্বইটা। সহজ সাহচর্যেও দিব্যি বোঝা যায় গাছপালাদের প্রাণের সঙ্গে ঠিক কী করে প্রেমময় সম্পর্ক গড়ে ওঠে বালক–‌বালিকাদের।
রান্নার পদবৃন্দও স্বগৌরবে, স্বাদে–‌গন্ধে অতুলনীয় ভোজনের ভূমিকায় তাঁরা ঘটি–‌বাঙালের তীব্র পছন্দ–‌অপছন্দের দেওয়াল ভেঙে দিতে পারে। প্রকৃত অর্থে দেয়ও। সাজুগুজু করা বিয়ের কনে বাপের বুকে ঝাঁপিয়ে কেঁদে ভাসায় আর স্মৃতিসুখে জেগে থাকে ডুমুর–‌মৌরলার চাটনি। জীবনের গল্পে ছোটদের সঙ্গে খুব বড়দের অটুট সখ্য উল্লেখিত হবে না— এমন কিছু বাস্তবে ঘটে না। সুতরাং ভীম— ভীমসেনের (‌অথবা সে মহীরাবণ)‌ মতো চেহারার মেটে আল খন্তার আঘাতে পরাজিত হয়ে মাটির ওপরে উঠে আসে। উচ্চারণের যে বর্ণ–‌বিপর্যয়, তাতে ‘‌শুঁটকি’‌ অনায়াসে ‘‌হুকটি’‌ হতে পারে কিন্তু প্রস্তুতির দক্ষতায় তা কিন্তু বহুবাসনায় দিগ্বিজয়ী। জানার সত্যিই কোনও শেষ নেই, নইলে কী করে শোনা যায় যে মিরগেল মাছে মৃগী হয়!‌ এবং ময়মনসিংহের সিংহশিশুরা পাঙাশমাছ পাতেই তোলে না।
যে কোনও সঙ্কলনগ্রন্থের সম্পাদনার ক্ষেত্রে বৈচিত্র‌্যময় সংগ্রহের উপস্থিতিই যদি প্রথম ও প্রধান কথা হয়, তা হলে সেক্ষেত্রেও বাড়তি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন সামরান ও দামু। নইলে রসনার বাসনাই যে সভ্যতার মূল শক্তি এবং আমাদের জিভ যদি নিষ্ক্রিয় বা স্বাদ–‌নিরপেক্ষ হত তা হলে হয়তো অনেক গণ–‌অভ্যুত্থানই হত না বা বাস্তবিক পৃথিবীর ইতিহাস অন্যরকম চরিত্র পেত— এমন যুক্তিসিদ্ধ প্রবন্ধ এই সঙ্কলনে স্থান পেত না।
রসনা আর বাসনা— এই দুটো শব্দ মিলে সঙ্কলনগ্রন্থের নামটি সুস্বাদু শোনালেও সামান্য বিভ্রান্তি কিন্তু থেকে গেছে। কয়েকটি অসামান্য লেখার মূল সুর কিন্তু ভিন্নধর্মী। নইলে স্মৃতির পথে হাঁটতে হাঁটতে অবিস্মরণীয় এক লেখায়— ‘‌বাবা কি আমার মাকে চিনতে পারেননি’‌ লিখতে হত না। কিছু ছাপার ভুলও থেকে গেছে। প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণে ভিন্নধর্মী দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন স্মারক রায়। ■

জনপ্রিয়

Back To Top