কথাসাহিত্যের নতুন পাঠ • কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী • সাহিত্যলোক • ১০০ টাকা
সুকুমার রায়ের আশ্চর্য জগৎ • কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী • পরম্পরা • ১৭৫ টাকা

বঙ্গসাহিত্যের বিবিধ প্রবণতাকে বিষয় ও আঙ্গিকগতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তীর ‘কথাসাহিত্যের নতুন পাঠ’–এ। গ্রন্থটিতে ক্ষেত্র গুপ্তর ভূমিকা–সহ চোদ্দোটি প্রবন্ধ আছে। আলোচনা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে বিমল কর পর্যন্ত প্রসারিত।
গ্রন্থের প্রাক্‌কথনে গ্রন্থকার জানিয়েছেন— ‘‌সাহিত্য সমালোচনায় বিভিন্ন কথাসাহিত্যিকের মূল শিল্প–প্রবণতা ও তাঁর জগৎটি আবিষ্কার করাই বর্তমান গ্রন্থের লক্ষ্য।...বাংলা কথাসাহিত্যের প্রধান লেখকদের সম্বন্ধে নতুন কথাই বলতে চেয়েছি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে।’‌ প্রতিশ্রুতি অনুসারে কয়েকটি সাহিত্যগ্রন্থের নিবিড় পাঠনির্ভর বিশ্লেষণ, তুলনামূলক আলোচনাপদ্ধতি ও ব্যতিক্রমী ভাবনায় বইটিতে ‘নতুন কথা’ বলেছেন কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী।
‘বাংলা উপন্যাসের পালাবদল’ প্রথম প্রবন্ধ। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে নায়িকাদের শরীরী বর্ণনায় বঙ্কিমচন্দ্রের আগ্রহ পরিহার করেছেন রবীন্দ্রনাথ। আবার বইয়ের চতুর্থ প্রবন্ধ ‘রবীন্দ্রগল্পের গদ্যভাষা’য় বিশ্বকবির কাব্যিকসত্তার প্রাধান্য স্বীকার করে বলেছেন— ‘‌গল্পের বক্তব্য, চরিত্র, কাহিনির আড়াল ঠেলে বহুবার বহুভাবে বেরিয়ে এসেছে সেই কাব্যভাষার নির্ভুল স্রোতধ্বনি।’‌(পৃ. ‌৪৯)
অন্য কয়েকটি প্রবন্ধে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রেমেন্দ্র মিত্রর কথাশিল্প নিয়ে সাহসী বক্তব্য পেশ করেছেন লেখক। ‘পূর্ণ প্রতিভার পার্শ্বজ্যোতি: নজরুলের গল্প’ প্রবন্ধটি কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তীর গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তির প্রভায় দীপ্ত। ‘রাক্ষুসী’ (‘রিক্তের বেদন’) গল্পটিকে নজরুলের শ্রেষ্ঠ কীর্তির অভিধা দিয়ে কবির লোকজ আভরণ সংগ্রহের প্রবণতাকে অভিনন্দিত করেছেন তিনি। বুদ্ধদেব বসু, সুনির্মল বসু ও বিমল কর সম্পর্কে তিনটি প্রবন্ধে ভাল–মন্দ বিশ্লেষণ করে কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী মনোনিবেশ করেছেন উপেক্ষিত সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষের প্রতি। ‘সন্তোষকুমার ঘোষ, উপক্রমণিকা’, ‘সন্তোষকুমার ঘোষের কথাসাহিত্যে নারী চরিত্রের প্রাধান্য’ ও ‘সন্তোষকুমার ঘোষের শেষ নমস্কার’— এই তিনটি প্রবন্ধে লেখকের রচনাতালিকা, গল্প, উপন্যাস ও অভিমানী ব্যক্তিসত্তা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। ‘কিনু গোয়ালার গলি’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘মোমের পুতুল’, ‘শেষ নমস্কার: শ্রীচরণেষু মাকে’র মতো উপন্যাস বা ‘ধাত্রী’, ‘যাদুঘর’, ‘কানাকড়ি’ ‘ঠাকুমার ঝুলি’র মতো গল্পের স্রষ্টা সন্তোষকুমার অকারণ ভাবালুতা ও সাহিত্যজাত দুর্নীতি বর্জন করেছিলেন বলেই পাঠকসমাজে খানিকটা ব্রাত্য ছিলেন, এমন মন্তব্য করেছেন কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী।

আরও বহু ‘নতুন কথা’ উচ্চারিত হয়েছে ‘কথাসাহিত্যের নতুন পাঠ’ গ্রন্থে।
ছিমছাম প্রচ্ছদ ও যথাযথ বাঁধাইসম্পন্ন বইটিতে কয়েকটি মুদ্রণপ্রমাদ রয়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে বইটি যথার্থ ‘নতুন পাঠ’ হওয়ার দাবি রাখে এ বিষয়ে কোনও সংশয়ের অবকাশ নেই।
ছড়া, কবিতা, গল্প, নাটক ও প্রবন্ধের স্রষ্টা সুকুমার রায়ের (১৮৮৭–১৯২৩ খ্রি.) সাহিত্যসম্ভার, জীবনবোধ ও প্রজ্ঞার আশ্চর্য বিশ্লেষণ কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তীর ‘সুকুমার রায়ের আশ্চর্য জগৎ’ গ্রন্থটিতে। লেখকের দীর্ঘ গবেষণার ফসল এই বইটির প্রথম সংস্করণ ১৯৮৩–তে প্রকাশিত হলেও ‘পরম্পরা’র বর্তমান সংস্করণটি সম্পূর্ণভাবে পরিমার্জিত। সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত গ্রন্থটিতে বাংলার সাহিত্য সমাজ সংস্কৃতির এক বিরল ব্যক্তিত্বের অন্তর্লোক ও বহির্লোকের অকপট উন্মোচন করেছেন কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী। সাহিত্যিক সুকুমারের প্রতিভা ও অন্তর্মনকে সমভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
প্রথম অধ্যায়ে কবির পারিবারিক জীবন, চিত্র ও সাহিত্য মনস্কতা, ‘ননসেন্স’ ও ‘মণ্ডা’ ক্লাবের প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি উল্লেখিত হয়েছে। ‘ছড়া, কবিতা’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধ্যায়ে সুকুমারের কাব্যপ্রতিভা পর্যালোচনা করে কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তীর মন্তব্য— ‘‌ছড়ায় উদ্ভট সৃষ্টির ও আপাত অর্থহীনতার (ননসেন্স) মধ্য দিয়ে রসসৃষ্টির কৃতিত্বে সুকুমার রায়ের জুড়ি নেই। আবোল তাবোল–‌এ আবার সেই কৃতিত্ব সমধিক উজ্জ্বল।’‌ (পৃ.‌ ৩৪) এভাবে ‘গল্প’, ‘ফ্যানটাসির জগৎ’, ‘নাটক’ ইত্যাদি অধ্যায়গুলিতে সুকুমার রায়ের নিপাট কৌতুকবোধ এবং স্থুল হাসি তথা অসঙ্গতির ইঙ্গিতসমূহকে সূক্ষভাবে বিশ্লেষণ করেছেন কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী। পাগলা দাশুর গল্পগুলি যদি হয় কিশোর মনের ‘এল–ডোরাডো‌’, তা হলে ‘‌হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরী’ ও ‘হ য ব র ল’ অ্যাবসার্ড, ফ্যানটাসির সর্বোত্তম শিল্পরূপ। আবার সুকুমার রায়ের শ্রেষ্ঠ নাটক ‘চলচ্চিত্ত–চঞ্চরি’ সম্বন্ধে কৃষ্ণরূপের বক্তব্য, এই নাটকের কোনও নির্দিষ্ট শ্রেণিবৈশিষ্ট্য নেই— ‘‌এটি আসলে এ ক্লাস বাই ইটসেলফ।’‌
ষষ্ঠ অধ্যায়ে যুক্তি, তথ্য ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির সমন্বয়ে রচিত সুকুমার রায়ের প্রবন্ধ সাহিত্যের ওপর আলোকপাত করে, সপ্তম অধ্যায়ে লেখক উল্লেখ করেছেন ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে লেখা সুকুমার রায়ের দীর্ঘ এক পত্রের কথা। রবীন্দ্রনাথকে ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’–এর সদস্যপদ প্রদান উপলক্ষে সমাজে প্রবীণদের আচরণ দেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সুকুমারের আত্ম–উন্মোচন রয়েছে পত্রটিতে। সত্যজিৎ রায়ের সংগ্রহ থেকে গৃহীত এই পত্রটিও সুকুমারের অকালমৃত্যুর যোগসূত্র নির্দেশ করে কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী নতুন ভাবনা উসকে দিয়েছেন পাঠকদের মনে। এখানেই সার্থক হয়ে যায় গ্রন্থটির উদ্দেশ্য। নির্ভুল মুদ্রণ‌, সুন্দর বাঁধাই ও সুকুমারের প্রতিকৃতি–সংবলিত প্রচ্ছদ ‘সুকুমার রায়ের আশ্চর্য জগৎ’ গ্রন্থটিকে বিশেষ মর্যাদায় উত্তীর্ণ করেছে।‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top