তানিয়া চক্রবর্তী

এলাটিং বেলাটিং (১ ও ২) • সম্পাদনা অরণি বসু, সামরান হুদা • প্রতি খণ্ড ৫০০ টাকা
কামলাসুন্দরী • সম্পাদনা জয়িতা বাগচী, সুমেরু মুখোপাধ্যায় • ৭৫০ টাকা
প্রকাশক ঌঋকাল বুকস 
মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট, সিমোন দ্য বোভেয়ার থেকে মল্লিকা সেনগুপ্ত অবধি সকলেই ক্রমাগত সমাজের চিহ্নিত মেয়েবেলার কথা বলেছেন। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি ছোটবেলা থেকে উদ্গত–চিহ্নিত যে মেয়েবেলা তারই আদ্যোপান্ত জুড়ে স্বপ্ন–দুঃস্বপ্নের বৈচিত্র্যে ভরা ‘‌এলাটিং বেলাটিং’‌ ও ‘‌কামলাসুন্দরী’‌ বই দুটি। ঌঋকাল প্রকাশনীর এই বই লেখার, সঙ্কলনে ও প্রকাশের কাঠামোয় বেশ অভিনব। অরণি বসু ও সামরান হুদা সম্পাদিত একুশ জন বিভিন্ন বয়সি লেখিকাদের যৌথ সাযুজ্যে রচিত হয়েছে ‘‌এলাটিং বেলাটিং’‌। এর সূচনাপর্বে বলা হয়েছে ‘‌বাউলনীর কাঁথার মতো‌ এই বই। ব্যাপ্তির বালিকাবেলার সেই কোকুন, যার ভেতরে শিশুকন্যারা ক্রমাগত বদলে গিয়েছে তারুণ্যে।’ কোকুন, যার ভেতরে প্রক্রিয়াকরণের মধ্যে দিয়ে যেমন হঠাৎ এক পূর্ণ প্রজাপতি বেরিয়ে আসে ঠিক তেমন করেই এখানে নারীরা তাদের ভিন্ন জীবন, ভিন্ন বাসস্থান, ভিন্ন বড় হয়ে ওঠার মধ্যে কোথাও যেন এক মৌলিক আঙ্গিকে পরিপূর্ণ। মন্দার মুখোপাধ্যায় লিখছেন ‘‌দাদারা যে মেয়ে বলে খেলায় নিত না’‌। বোঝা যায় ছোটবেলার এই মন ভেদ বোঝেনি, বোঝেনি মেয়েবেলা। সেসব খেলতে চেয়েছে তাই রান্নাবাটি, ‘‌এলাটিং বেলাটিং সই লো/ কীসের খবর আই লো’‌, রামসীতা ফল হয়ে সারল্যের হাত–পা অবিরাম খেলতে খেলতে কখন নারীত্বের গম্ভীর ছোঁয়া পেয়ে গেল সেও বুঝল না। দেবারতি মিত্র লিখছেন তাঁর সমসাময়িক বন্ধুতা না পাওয়ার এক রুদ্ধদ্বার কখন যেন তাঁর কবিতায়, গানে, বাবার সঙ্গে নিবিড় গাছপালার ছায়ায় অজান্তে এক দরাজ মুক্তির পথ হয়ে খুলে গেল। শৈশবের শল্কপত্র খুলে খুলে এক স্বপ্নের মেয়েবেলার মধ্যে ক্রমাগত জারিত হয়ে যেতে থাকলেন তিনি। যশোধরা রায়চৌধুরীর লেখার প্রারম্ভেই মেয়েবেলা থেকে বিচ্ছিন্ন এক নিরপেক্ষ ছোটবেলা এসে হাতছানি দেয়। তাঁর মায়ের কথা, রেডিয়োর গান, ফুচকা, বইপড়া, ছবি আঁকা— সবমিলিয়ে আবিষ্কৃত ব্যাপ্তির আবহে এসেও উজ্জ্বল। সেই শৈশব পেরিয়ে একদিন ধারারেখ অস্তিত্ব নিজের পরিচয় নিয়ে সচেতন হতে থাকে। ছোটবেলার মেয়েবেলা প্রসারিত হতে থাকে। এইসমস্ত মসৃণ ছোটবেলার ফাঁক থেকে কখনো কখনো প্রকট হয়ে ওঠে কেবল মেয়েবেলা। তখন ঈশানী রায়চৌধুরী লেখেন তাঁর জন্মের প্রাথমিক কোনও আহ্লাদ নেই। রঙিন টিকিট জমানো স্বপ্নের শৈশব শুধু মেয়ে বলেই যেন অযাচিত অসহ্য স্পর্শের চমকে বিদ্ধ হতে থাকে।
জয়িতা বসু ও সুমেরু মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘‌কামলাসুন্দরী’‌ বইটিতে পঁয়ত্রিশ জন কর্মারতা মেয়ে কেউ কবি, ডাক্তার, সঞ্চালক, প্রকাশক, খেলোয়াড়, শিক্ষিকা এইসব বিভিন্ন রূপে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তাঁদের কথা লিখেছেন। এই জীবনের ভেতরে কতখানি তাঁরা মেয়ে কিংবা মানুষ হয়ে থাকতে পেরেছেন সেই কথা বেরিয়ে এসেছে। পার্বতী বাউল তাঁর ‘‌বাউল জীবনের পথে পথে’‌ শীর্ষক লেখায় লিখছেন তাঁর শিক্ষিত জীবনে স্বেচ্ছায় বাউল হওয়ার বাসনাকে তাঁর নিকটস্থ আত্মীয়জনেরাই কুনজরে দেখেছন। রেবা রক্ষিত লিখছেন তাঁর জীবনে একাধারে মায়ের প্রেরণা অন্যদিকে শম্ভু মল্লিক, বিষ্টু ঘোষের মতো মানুষের সংস্পর্শ যেমন পেয়েছেন তেমনই কেউ কেউ সুযোগ নিয়ে তাঁকে বিনা পারশ্রমিকেও কাজ করিয়ে নিয়েছেন। অদিতি বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন জেন্ডার ইক্যুয়ালিটিকে অযথা ব্যবহারে প্রহসন তৈরি করার কথা। যেমন শিক্ষিত বাবা–মা–ই বলছেন— ‘‌আমার মেয়ে সন্তানকে আমি ছেলের মতো করে মানুষ করেছি’‌ অর্থাৎ যে জিনিস ভেঙে এগোতে আমরা উদগ্রীব সেই জিনিসই আমরা অভ্যাসে, অবচেতনে কোথাও গড়েও দিচ্ছি। সোমাইয়া আখতার, অদিতি বসু রায় লিখেছেন কীভাবে নিজের শর্তে বাঁচতে তাঁরা সমাজসৃষ্ট বাধা–বিপত্তিকে পেছনে ঠেলে এগিয়ে এসেছেন! একটি গাঠনিক সমাজের আদ্যন্ত মূলে আঘাত করতে পারে দুটি জিনিস। এক, মেয়েদের শিক্ষা। দুই, মেয়েদের কর্মসংস্থান। কারণ, তার আগে পরে ইতিবাচক, নেতিবাচক সবকিছুতেই তাঁরা বিতর্কের শিকার।
এই দুটি বই আসলে দু–মলাটের মধ্যে নারীজীবনের বিভিন্ন ধারাকে দেখিয়েছে যা আসলে ঘনীভূত নারীত্বের একক জয়গান।‌‌‌‌ ■
 

জনপ্রিয়

Back To Top