রাজীব ঘোষ

নুনেতে ভাতেতে (‌প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)‌ • সম্পাদনা রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল ও অনার্য তাপস • দ্য কাফে টেবল • 
৩২৫ টাকা ও ২২৫ টাকা

ফেসবুক নিছক একটি মাধ্যম থেকে ধর্ম হয়ে উঠেছে, ফেসবুকীয় সম্প্রদায়ের সমবেত চর্চায় বাংলা সাহিত্যচর্চারও প্রভূত উপকার হচ্ছে বইকি। লাইকানো–পোস্টানো–খেস্তানো, এই ‘‌ত্রিসন্ধ্যা’‌ পালনের বৃত্তের বাইরে অনেকেই সংগঠিতভাবে সৃজন করছেন। প্রাথমিক হাহাকার তথা উন্নাসিকতা কাটিয়ে বিশুদ্ধবাদীরাও ফেসবুকে শামিল হচ্ছেন। বাংলা লিপি প্রযুক্তির কঁাটাতার টপকে ফেসবুকের আঙিনায় পা রাখতেই একাকার হয়ে গেছে দুই বাংলা। বস্তুত বিশ্বগ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাঙালি মননের সোৎসাহ মিতালিতেই সমৃদ্ধ হচ্ছে ভাষা। এরই মধ্যে ঈর্ষণীয় একটি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন একটি গোষ্ঠী ফেসবুক থেকে সরাসরি ‘‌বুক’‌ প্রকাশ করে। এমন ঘটনা ইদানীং ঘটছে, তবে এঁদের মুনশিয়ানা পাকসাহিত্যে। আমাদের মা–‌ঠাকুমার আমলে দেখেছি দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর, মেলে রাখা জামা‌কাপড় তোলার ফঁাকে এ ছাদ থেকে ও ছাদে পাকপ্রণালী বিনিময় চলত। ও বাড়ির রন্ধনশৈলী শিখে নিয়ে পরদিন এ বাড়ির পাতে, তারই কিছুটা কঁাসার বাটিতে ভরে ও বাড়িতে দিয়ে আসা পরখ করার জন্য। ও বাড়ি থেকেও তেমনি বাটিভরা এটা–সেটা আসত বইকি। কেউ কুমিল্লা, কেউ বা বঁাকুড়া, কেউ খাস কলকাতার। স্বাদকোরকে মিলেমিশে একাকার, দুর্নিবার।
‘‌নুনেতে ভাতেতে’‌ খাদ্যসংস্কৃতি বিষয়ক সঙ্কলন বলে ঘোষণা করেছেন দুই সম্পাদক। দ্বিতীয় খণ্ডটি বলেছে হারিয়ে যাওয়া খাবারের গল্প। খাদ্যসংস্কৃতি কী?‌ তার একটা ব্যাখ্যাও তঁারা দিয়েছেন। সেটা এইরকম:‌ ‘‌আমরা খাদ্য–‌সংস্কৃতি বলতে শুধুমাত্র রেসিপি বা রান্নার পদ্ধতিকেই নির্দেশ করছি না। বরং শস্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, খাদ্যোপযোগীকরণ, রান্না, পরিবেশনরীতি, খাওয়া, খাদ্য বা শস্যকে নিয়ে গড়ে ওঠা মানুষের আচার প্রথা সংস্কার (‌ইত্যাদি)‌ এবং বর্জ্যব্যবস্থাপনা— ‌এই পুরো চক্রটিই মূলত খাদ্যসংস্কৃতির অঙ্গীভূত বলে মনে হয় আমাদের কাছে।’‌ এই পর্যন্ত পড়ে যাঁরা ভাববেন নিছক কিছু কাষ্ঠ–‌প্রবন্ধের কথা বলছি, তঁারা ভুল করবেন, পাকসাহিত্যে রসের কোনও অভাব নেই। বিরিয়ানি নিয়ে লেখা শুরু হচ্ছে মির্জা গালিবের শের দিয়ে, আর লেখকের বক্তব্য, ‘‌চিকেন বা ভেজ বিরিয়ানি অক্সিমোরোন, ওরকম কোনও বিরিয়ানি হয় না। ওসব গতজন্মের কর্মফলে যঁারা পতিত, তঁাদের জন্য সান্ত্বনার তামাদি টিকিট।’‌
পেটুককুলে কুলীন বলে আমার ঢের সুনাম ও দুর্নাম দুই হয়েছে, সেই সুবাদেই এই দুটি বই চেখে দেখার সৌভাগ্য হল। পূর্ববঙ্গ তো বটেই, ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, পুরুলিয়ার আদিবাসীদের খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে জানা গেল। উত্তর আমেরিকার আদিবাসী রান্নার টুকিটাকিও!‌ শ্লোক, ছড়া, লালনের গান, পাক–‌প্রণালী, ইতিহাস, ভূগোল— রান্নায় লাগসই মশলা দিতে কসুর করেননি সম্পাদকেরা। খেয়ে দেখুন, পড়ে দেখুন, তৃপ্তির ঢেকুর অনিবার্য।‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top