সম্রাট মুখোপাধ্যায়: নাটক চলছে ‘‌শিবাজী’‌। গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখা। গিরিশচন্দ্র নিজে অভিনয় করছেন আওরঙ্গজেব চরিত্রে। শিবাজিকে আনা হয়েছে আওরঙ্গজেবের দরবারে। দীর্ঘ আর তীব্র সংলাপ চলছে শিবাজির। প্রতিক্রিয়াহীন আওরঙ্গজেব শুধু কী একটা লিখে যাচ্ছেন। তার ভেতরই তিনটি দৃষ্টিপাত করলেন। তিনটিই মর্মভেদী। একটি শিবাজির প্রতি। একটি হিন্দু সভাসদদের প্রতি, এই বক্তৃতায় তাঁদের প্রতিক্রিয়া বুঝতে। আর–একটি মুসলিম সভাসদদের প্রতি, যে ‘‌তৈরি থেকো’‌।
এই অভিনয় দেখে শিশিরকুমার ভাদুড়ীর মনে হয়েছিল যে, একটা চরিত্র এবং একটা নাটক যেন মাত্র ওই তিনটি দৃষ্টিপাতে সম্পন্ন হয়ে গেল। ছাত্র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনাকালে একে তিনি বলেছিলেন, ‘‌ইকোনমি অব এক্সপ্রেশনস’‌। বলেছিলেন, ‘‌শিক্ষণীয়’‌। বড় প্রাসঙ্গিক এই উদাহরণটি গিরিশবাবুর কথা মনে করাতে গিয়ে লিখেছেন সুব্রত ঘোষ। ‘‌গুরুকুল ও গিরিশচন্দ্র’‌ প্রবন্ধে— সুসম্পাদিত, সুগ্রথিত এই ‘‌গিরিশ কথা’‌ গ্রন্থে। এ বই আসলে মিনার্ভা নাট্যসংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্রের মুখপত্র ‘‌চর্চা’‌র এক বিশেষ সংখ্যা। যা তৈরি করা হয়েছে নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষের ১৭৫তম জন্মবর্ষপূর্তি উপলক্ষে। নিয়মিত সম্পাদক সত্য ভাদুড়ীর পাশাপাশি এই বিপুলায়তন সংখ্যায় অতিথি সম্পাদক হিসাবে এসেছেন ব্রাত্য বসু। এ বইয়ের সম্পাদকীয় ভূমিকাটি তাঁরই লেখা।
পাশাপাশি একটি সুগভীর প্রবন্ধও লিখেছেন ব্রাত্য। শিরোনাম ‘‌গিরিশচন্দ্র:‌ নীলকণ্ঠ নির্দেশকের খোঁজে’‌। যেখানে ব্রাত্য দেখাচ্ছেন বাংলা থিয়েটারে গিরিশচন্দ্রই প্রথম নাট্য–ডিরেক্টর তো বটেই, প্রথম সেই নাট্য–ব্যক্তিত্বও, যাঁর কাজের ভেতর আন্তর্জাতিক নাট্যমান তথা ভাবনার নিরিখ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
ব্রাত্যর এই আলোচনাটির গুরুত্ব এখানেই যে, এতদিন গিরিশ–‌সংক্রান্ত আলোচনায় মূলত বাঙালির নবজাগরণ–সংক্রান্ত যে ‘‌প্যারাডাইম’‌টি কাজ করত, তিনি তা থেকে সরে এসে গিরিশকে দেখতে চেয়েছেন তৎকালীন বিশ্বনাট্যের নানা ভাবনা আর ভাঙচুরের প্রেক্ষিতে। লেখা শুরু করেছেন ভিক্টর হুগোর ‘‌আঁভা গার্দ’ থিয়েটার–বিষয়ক ইস্তেহারের কথা দিয়ে। সেই ইস্তেহারে থাকা ভাবনার মঞ্চে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের উত্থানের যে সম্ভাবনা, তাকেই ব্রাত্য রূপায়িত হতে দেখেছেন গিরিশবাবুর কাজের মধ্যে। লেখার শেষে পৌঁছে ব্রাত্যর উপসিদ্ধান্তটিও একঝলক নতুন ভাবনা আনে। তিনি উল্লেখ করেন গিরিশচন্দ্রের সেই বিখ্যাত উন্মুক্ত গাত্র ও ঘর্মকণ্টকিত ছবিটির কথা। রামমোহন, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথদের তথাকথিত ‘‌এলিট’‌, ‘‌বুদ্ধিমার্গী’‌ ছবির বিপরীতে। মনে করিয়ে দেন গিরিশচন্দ্রের ওই ছবিই বুঝিয়ে দেয়, তিনি ছিলেন এমন এক কলাবিদ্যায়, যা দিন–আনি–দিন–খাই মানুষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।
দু’‌ডজন প্রবন্ধের সঙ্কলন‌ এই গ্রন্থ বা পত্রিকা। কমবেশি সব ক’‌টি প্রবন্ধই মূল্যবান। সম্পাদকীয় পরিকল্পনার বিষয় নির্বাচনে বৈচিত্র‌্য আছে। প্রায় প্রত্যেকেই সু‌লেখক হওয়ায় লেখাগুলিও সুখপাঠ্য। উদ্ধৃতি–কণ্টকিত নয়। মৌলিক। শেষে আছে সুসংযোজিত তথ্যমালা। তবে সেখানে একটি জীবনপঞ্জি দরকার ছিল। চিত্রমালাও উল্লেখযোগ্য। বিশেষত যে সিরিজটিতে অভিনেতা গিরিশ নানারকম অভিব্যক্তির ছায়াপাত ঘটাচ্ছেন। এমনতর দুষ্প্রাপ্য কোনও ছবি দিয়ে প্রচ্ছদটি হলে বোধ হয় ভাল হত। আর মাইকেল বা রবীন্দ্রনাথের বহুদৃষ্ট ছবি সংযোজন অর্থহীন লাগল।
যে বইয়ের লেখক তালিকায় থাকেন বিভাস চক্রবর্তী, অশোক মুখোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র, চন্দন সেন, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার দাশ, ভবেশ দাসেরা— সে সঙ্কলন তো ধারে–‌ভারে অবশ্য–সংগ্রহ হবেই। বাগবাজার ও গিরিশচন্দ্রের সম্পর্ক নিয়ে বিষ্ণু বসুর লেখাটি সঙ্কলনে বড় পাওনা। ■

জনপ্রিয়

Back To Top