ঈশা দাশগুপ্ত: এ এক অন্য রায়বাড়ির গল্প। বিখ্যাত রায়বাড়ি, বিখ্যাত তার আভিজাত্য— তবে আজ তা তলানিতে। রায়বাড়ির অকথিত সত্যের এক অবাক-করা আয়না ‘শ্রীলতা ও সম্পা’ উপন্যাস। লেখিকা বাণী রায়। গিরিবালা দেবীর ‘রায়বাড়ি’ আমরা আগেই পড়েছি, গিরিবালা দেবীরই আত্মজা বাণী রায়। স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের করা পরিবার–‌সারণি জানাচ্ছে যে, উপেন্দ্রকিশোরের বোন গিরিবালা দেবী। গিরিবালা দেবী ও দীননাথ নন্দী চৌধুরির কন্যা বাণী রায়। 
এতটা আমাদের অনেকেরই হয়ত জানা। আরও অনেকটাই যে না–‌জানা, এবং সেই অনেকটা না–‌জানতে পারলে যে বাংলা সাহিত্যের এক অদম্য আধুনিকতা অজানা থেকে যায়— তা বোঝার জন্য বাণী রায় রচনাবলী হাতে তুলতেই হবে।
সাফো প্রেম। শব্দটা লেখিকা নিজেই ব্যবহার করেছেন। এবং ব্যবহার করেছেন সেই ১৯৪২ সালে, তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘প্রেম’-এর পাতায়, নায়িকা রূপালির প্রেমজীবন বর্ণনায়। সেই সময়ের আয়নায় ভাবলে অবিশ্বাস্য লাগে। বাণী রায়ের নিজের বর্ণনায় যে মেয়ে ‘ভাগ্যহীনা, কিন্তু চরিত্রহীনা নয়’। রূপালি ‘একটি প্রেমিক নারীমন’ যে সমকাম, বহুকাম, লঘুকাম নানা ধারার মধ্যে খুঁজে বেড়ায়, শেষ প্রাপ্তিতে পৌঁছলে তার আর চাঞ্চল্য থাকে না। 
আইএ পরীক্ষার পরের ছুটিতে রূপালির জীবনের এই অবাক-করা গল্প লিখতে শুরু করেন বাণী রায়, তার পরে নানা সময়ে একটু একটু করে শেষ হয় উপন্যাস ১৯৪১ সালে। ১৯৪২ সালে এই উপন্যাসের একটি অংশ প্রকাশ পেয়েছিল ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায়। লেখিকা বাণী রায় তাঁর পারিবারিক আভিজাত্যের রক্ষাকবচ সত্ত্বেও তুমুল নিন্দিত হন। মোহিতলাল মজুমদার স্বয়ং নির্দেশ দেন, প্রকাশ বন্ধ করতে বাধ্য হন সজনীকান্ত দাশ। ১৯৪৩ সালে জেনারেল প্রিন্টার্স থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল ‘প্রেম’, অসম্পাদিত এবং অসংশোধিত ভাবেই। সাহিত্য সমালোচক সুদক্ষিণা ঘোষ স্বীকার করেন ‘‌রূপালির মতো কোন মেয়েকে দেখে সেদিন মোহিতলাল মজুমদার বা সজনীকান্ত দাশদের এই প্রতিক্রিয়া হওয়াটা কি সত্যিই খুব আশ্চর্যের?’‌ শুধু বিষয় নয়, প্রকাশভঙ্গিতেও সেই অযুগোচিত বিস্ময়। রূপালির জীবনের বর্ণনা আসা–‌যাওয়া করেছে ফ্ল্যাশব্যাকের রাস্তায়, লেখিকা সেখানে নির্লিপ্ত কথক মাত্র। 
পরের উপন্যাস ‘‌শ্রীলতা ও সম্পা’‌, যা এই সঙ্কলনেরও উপন্যাস তালিকায় দ্বিতীয়, লেখিকার পূর্বপরিকল্পিত উপন্যাস। লেখিকা নিজেই যে উপন্যাস সম্পর্কে বলেছেন— ‘শ্রীলতা ও সম্পা’ আমার পরিকল্পিত ‘রায়বাড়ী’ (বানান অপরিবর্তিত) নামের চতুর্মুখ উপন্যাসের দুইটি মুখ মাত্র।’‌ এই উপন্যাসের ‘দুটি মুখ’ স্বয়ংসম্পূর্ণ সংরক্ষিত খণ্ড উপন্যাসের রূপে ছিল। আরও দুই খণ্ড লেখা হলে চারখণ্ডে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হবে, এই ইচ্ছা ছিল লেখিকার। আঙ্গিকের দিক থেকে আবার নিজের লেখনীকে অন্য নিরীক্ষার দিকে নিয়ে গেছেন। নিজে স্বীকার করেছেন— ‘‌আমার লেখা ‘প্রেম’ উপন্যাস বা ‘সপ্তসাগর’ রচনাসংগ্রহে প্রকাশিত ‘উপসংহার’ উপন্যাসখানির সঙ্গে যাঁরা পরিচিত আছেন, তাঁরা ‘শ্রীলতা ও সম্পা’র ভাষা ও আঙ্গিকের প্রাচীনত্বে হয়ত বিস্ময় বোধ করবেন। আধুনিক রচনার বিশ্লেষণী ভঙ্গি ও মনস্তত্ত্ব প্রাচীন ভাষা ও আঙ্গিকে কতটা রক্ষা করা যায়— এ-ও একটি পরীক্ষা।’‌
শুধু আঙ্গিকের আধুনিকতা, চরিত্রের স্পষ্টতা নয়, বাণী রায়ের উচ্চারণে অনায়াস ভাষা পেয়েছে মেয়েদের দেহের বর্ণনা, শরীরের অভিমত। 
‘‌কেবল গভীর রাত্রে চোখে তার ঘুম যখন আসত না, তখন সে ভাবতে থাকত স্ত্রী-পুরুষের যৌন মিলনের কথা। তার মুদিত চোখের সামনে সে কল্পনা করতে থাকত, কত তরুণ-তরুণীর গোপন অভিসার, কত দৈহিক প্রেমের খুঁটিনাটি দৃশ্য।’‌ 
বিশ শতকের চল্লিশের দশকে এক মহিলা লেখকের কলমে এমন নিঃসঙ্কোচ উচ্চারণ? ঝড় না উঠে যাবে কোথায়?
এমন যুগের থেকে অনেক পা এগিয়ে থাকা নারীবাদ! শুধু প্রথম উপন্যাস ‘প্রেম’-এর রূপালি নয়, শ্রীলতা, সম্পা, ‘আরও কথা বলে’ উপন্যাসের মণিমালা, ‘মিস বোসের কাহিনী’র মিস বোস— প্রত্যেকেই আজও কী ভয়ঙ্কর বাস্তব, অতিরিক্ত প্রাসঙ্গিক। সেই লেখিকা বাণী রায়ের জন্মশতবর্ষ। আর এই জন্মশতবর্ষে বাংলা সাহিত্যে আরও এক প্রামাণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল ‘এবং মুশায়েরা’। বাণী রায়ের পাঁচটি উপন্যাস— প্রেম (১৯৪৩), শ্রীলতা ও সম্পা (১৯৫৩), আরও কথা বলো (১৯৫৪), মিস বোসের কাহিনী (১৯৬১) ও সাতটি রাত্রি (১৯৬২)— মলাটবন্দি করে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে তারা। শ্রীমতী সুদক্ষিণা ঘোষের মননঋদ্ধ ভূমিকাটি আমাদের উপরি পাওনা।
আত্মবিস্মরণ আমাদের জাতীয় বা প্রাদেশিক রোগ। এই রচনাবলী অন্তত একরকম প্রায়শ্চিত্ত। ■
বাণী রায় রচনাবলী ‌•‌ এবং মুশায়েরা ‌•‌ ৫০০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top