কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী 
প্রবন্ধসংগ্রহ • রবিন পাল •
এবং মুশায়েরা • ৪৫০ টাকা
রবিন পাল পরিচিত অধ্যাপক, পরিশ্রমী গবেষক এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তাশীল প্রবন্ধ রচনা করে আসছেন। বর্তমান গ্রন্থের সমস্ত প্রবন্ধই নতুন; অর্থাৎ এ‌–যাবৎ তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থাদিতে এদের দেখা মিলবে না। এই বইয়ে লেখকের দেশি–‌বিদেশি বিভিন্ন বিচিত্র সাহিত্যের নিবিড় পাঠ এবং সে–‌সম্বন্ধে সুচিন্তিত মতামত মননশীল পাঠককে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করবে। এখানে যেমন কিছু বিষয়ভিত্তিক নিবন্ধ স্থান পেয়েছে, তেমনি তাদের সঙ্গে এদেশি–‌বিদেশি সাহিত্যিকদের ওপরেও লেখক তাঁর মননের জাল বিছিয়েছেন। প্রথম ভাগে যদি ‘‌ইতিহাস ও সাহিত্য’‌, ‘‌চিত্রকলা ও কথাসাহিত্য’‌, ‘‌উনিশ শতকে মেয়েরা: সমাজে ও সাহিত্যে’‌, ‘‌বিশ্বায়ন ও বাংলা গল্প উপন্যাস’‌, ‘‌হ্যামলেট নিয়ে’‌, ‘‌আরব্য রজনীর গল্পের করণ কৌশল:‌ কিছু কথা’‌ প্রভৃতি প্রবন্ধ স্থান পায়, তবে দ্বিতীয় ভাগে থাকবে চিন্তাবিদ ও সাহিত্য ব্যক্তিত্বদের ঘিরে রবিন পাল মশাইয়ের চিন্তাভাবনা ও মন্তব্যাদি। এই সূত্রে টলস্টয় (‌দুটি প্রবন্ধে দুই চিন্তাসূত্রে গ্রথিত)‌, শলোকভ, রোমা রোলাঁ, ফ্রাঞ্চ ফানো, ডিকেন্স, সেরভেনতেসের ডন কুইক্সট (‌পরিচিত উচ্চারণে)‌, বিপ্লবী ও নারীবাদী লেনিন–‌বান্ধবী ইনেসা আরমান্দ যেমন রয়েছেন, তেমনি গ্রন্থভুক্ত হয়েছেন আমাদের কিছু চিরচেনা লোকজনও। এই যেমন জলধর সেন, বঙ্কিমচন্দ্র তো আছেনই, আখতারুজ্জমান ইলিয়াস, গোপাল হালদার, অক্ষয়কুমার মৈত্র প্রমুখ।
বাঙালি লেখকদের সম্বন্ধে ‘‌চিরচেনা’‌ কথাটা বলেছি বটে, কিন্তু রবিনবাবু এমন অনায়াসে তরতর করে তাঁর প্রবন্ধে চিন্তার ক্রমকে বাড়িয়ে নিয়ে যান যে, বিদেশি লেখক ও ব্যক্তিত্বদেরও আর খুব অচেনা বলে মনে হয় না। যেমন ধরা যাক, ‘‌ইনেসা আরমান্দ: বিপ্লব বন্দনায় উপেক্ষিতা’‌ প্রবন্ধটির সূত্রপাত ও বিকাশ। “‌‌ইনেসা আরমান্দের কথা প্রথম শুনি এক তরুণ কেমিস্ট্রি শিক্ষকের কাছে যিনি স্কুলে আমার সহকর্মী ছিলেন। .‌.‌.‌কে এই ইনেসা?‌ লোকে জানত তিনি এক সুন্দরী রমণী, ভাল পিয়ানো বাজাতে পারেন, কথা বলতে পারেন চারটে ভাষায়। এক সময় জানা গেল সাম্রাজ্যবাদী পর্বে সোভিয়েত পর্বের প্রথম দিকে তিনি ছিলেন নারী আন্দোলনের কর্মী, লেনিন–‌বান্ধবী এই নারী ছিলেন এক বিপ্লবী, এক ফেমিনিস্ট। স্ট্যালিন জমানায় এঁর কথা চাপা পড়ে যায় .‌.‌.তাঁকে লেখা লেনিনের ১১৮টি চিঠি, আরমান্দের ২/‌১‌টি স্মৃতিকথা, ৩৫টি সংবাদপত্রীয় রচনা, ৩টি পুস্তিকা পাঠকের কৌতুহল বাড়িয়েই চলে।”‌ একেবারে হাত ধরে এইভাবে রবিনবাবু তাঁর ‘‌অনপঢ়’‌ পাঠককে নিয়ে গিয়ে বিষয়ের ও ব্যক্তিত্বের অন্দরমহলে ঢুকে পড়েন। যেন ওই সহজিয়া ভঙ্গিমার মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রবন্ধিকের আশ্বাসবাণী যে, আমিও তো এ বিষয়ে তোমার মতোই কিছু জানতাম না, এখন কিছু জেনে তোমাদের জানাচ্ছি, এ কেবলই বিষয়টির প্রথম পাঠ। উৎসাহিত হলে পাঠক পরবর্তী পাঠক্রমে ঢুকে পড়বেন। এইটিই আসল কথা— সবাই সব কিছু জানবে না, কিন্তু লেখক হিসেবে পাঠকের মনটিকে দীপিত করা চাই।
সব প্রবন্ধই অবশ্য একই ভঙ্গিতে রচিত নয়। ইলিয়াস সম্বন্ধে বলতে গিয়ে ম্যাজিক রিয়ালিজ্‌মের তত্ত্ব (‌ও তথ্য)‌, সেরভেনতেসের ‘‌ডন কুইক্সট’‌ কেন মার্কসের প্রিয় বই ছিল, এপিক উপন্যাসের ধারায় শলোকভের ‘‌ধীরে বহে ডন’‌, ‘‌বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস ভাবনা’— প্রভৃতি লেখা খুব সহজ গান নয়। কিন্তু রবিনবাবুর লেখার মধ্যে যেমন দেশি–‌বিদেশি প্রাসঙ্গিক খবর মিলবে, তেমনি পাওয়া যাবে স্বতোৎসারিত প্রকাশভঙ্গির সহজতা। ফলে বইটি অনুসন্ধানী পাঠকের দরবারে গৃহীত হবে বলেই মনে করি। কয়েকটি ছেলেমানুষি মুদ্রণপ্রমাদ পাঠককে পীড়িত করে। যেমন ২৭৩ পৃষ্ঠায় ‘‌সংস্কৃতিবান’‌ (‌‌‌–মান হবে)‌ শব্দটি। পরবর্তী সংস্করণে নিশ্চয়ই শুদ্ধ হবে। সুন্দর কাগজে বইটির ছাপা–বাঁধাই বেশ পরিপাটি। বইয়ের প্রচ্ছদ তুলনায় অপরিচিত এক চিত্রীর অসামান্য একটি কারুকাজ। ■

জনপ্রিয়

Back To Top