শম্পা ঘোষ

‘‌হে মাধবী, ভীরু মাধবী
তোমার দ্বিধা কেন
আসিবে কি ফিরিবে কি, দ্বিধা কেন।’‌
‘‌মাধবী হঠাৎ কোথা হতে এল
ফাগুন দিনের স্রোতে।
এসে হেসেই বলে ‘‌যাই যাই যাই।’‌
গ্রীষ্ম ও বর্ষায় যে ফুলটিকে গেটের উপরে, পাঁচিলে লতিয়ে উঠতে দেখা যায়, যে রোজ সন্ধ্যায় সুগন্ধ বিলোয়, যাকে এতদিন ‘‌মাধবীলতা’‌ বলে জেনে এসেছি, সে যে ‘‌মধুমঞ্জরী’‌ সেই ভুল আজ ভাঙল। মধুমঞ্জরীর নাম রবীন্দ্রনাথের দেওয়া। এই দুটি তথ্য জানলাম ‘‌শান্তিনিকেতনের ফুল’‌ বইটি থেকে। লেখক শ্রীযাযাবর। এটি তাঁর ছদ্মনাম। তাঁর আসল নাম সন্দীপকুমার দাস। দু মলাটের ঘেরাটোপে অসংখ্য চেনা–‌অচেনা ফুলের অনন্যসুন্দর আলোকচিত্র রয়েছে, যা দেখে প্রথমেই ভাললাগা তৈরি হয়। প্রতিটি ফুল কোন পরিবারের অন্তর্গত, তার প্রাপ্তিস্থান, তার বৈজ্ঞানিক নাম সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয়েই লেখক আলোকপাত করেছেন। সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কবিতা–‌গানকে মিশিয়ে দিয়েছেন সুচারুভাবে। শান্তিনিকেতনবাসী না হয়েও কেবলমাত্র ফুল, শান্তিনিকেতন আর রবীন্দ্রনাথকে ভালবেসে যে লেখক এমন সুন্দর একটি গ্রন্থের রূপকার হলেন, তা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।
বইটি পড়তে গিয়ে অনেক স্মৃতি ভিড় করে এল। কৈশোরে ছাত্রাবস্থায় প্রতিদিনের চলাফেরার পথে এরকম অজস্র ফুল দেখেছি, দেখে ভাললাগার আনন্দেই মশগুল হয়ে থেকেছি। তার নামধাম পরিচয় নিয়ে মাথা ঘামাইনি। লেবুদার বাংলা ক্লাস যেখানে হত, তার কাছাকাছি একটা মহুয়া গাছ ছিল। মার্চ–‌এপ্রিলে সকালে যখন ক্লাসে যেতাম, দেখতাম লাল কাঁকড়ের উপরে আঙুরের মতো হলুদ ফুল ছড়িয়ে আছে। আমাদের মাটিতে বসার আসন দিয়ে সেই ফুল, পড়ে–‌থাকা ফল সরিয়ে বসতাম। আর গন্ধে খানিক অস্থির হতাম।
‘‌বাঁদরলাঠি’‌ গাছের নীচে বসে আমরা বিশ্বনাথদার অঙ্ক ক্লাস করতাম। লেবুদার ক্লাস থেকে একছুটে বেরিয়ে, ঘণ্টাতলা, গৌরপ্রাঙ্গণ পেরিয়ে, দিনান্তিকার পাশ দিয়ে শিমুল ফুল মাড়িয়ে অবশেষে অঙ্ক ক্লাসে ছায়ার দিকটা দখল করতাম। একবার ছায়াঘেরা দিকটাতে বসতে পারলে আর চিন্তা ছিল না। মেয়েরা সেই দিকেই বসবে। বিশ্বনাথদা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মাঝেমধ্যেই আমাদের জায়গা বদলে দিতেন। বসার জায়গাটা আমাদের ভাবনায় থাকত। অত সুন্দর গাছের নীচে যে বসে আছি, সে খেয়াল হত না। শুধু চারপাশটা হলুদ আলোয় ভরে থাকত, এটা বেশ মনে পড়ছে। আবার কখনও শিরীষ গাছের ছায়ায় বসে ক্লাস করতে করতে শিরীষ ফুল তুলে নিয়ে সুড়সুড়ি খেতাম। দোলের সময় পলাশ ফুলের মালা গেঁথে পরেছি। ‘‌পাতাবাদাম’‌ বলে একটা গাছ ছিল মন্দিরের সামনে। গোল তামাটে রঙের চ্যাপ্টা পাতার ঠিক মাঝখানে একটু উঁচু হয়ে বাদামটা থাকত। আমরা কুড়োতাম আর পাতার ছাল ছাড়িয়ে বাদাম মুখে পুরতাম। সংগ্রহ করে হরলিক্সের শিশিতেও ভরে রাখতাম। শান্তিনিকেতনের ফুল গাছপালা আমাদের এইরকম অনুষঙ্গেই বেঁধে রেখেছিল।
আজ এই বই পড়ে জানতে পারলাম, রবীন্দ্রনাথ কত ফুলেরই না নামকরণ করেছেন!‌ যেমন, বাঁদরলাঠির নাম রাখলেন ‘‌অমলতাস’‌। এই তালিকায় আরও আছে। ‘‌বনপুলক’‌, ‘‌হিমঝুরি’‌, ‘‌অলকানন্দা’‌, ‘‌নীলমণি লতা’‌, ‘‌সোনাঝুরি’‌ ইত্যাদি।  লেখক জানিয়েছেন যে, আমাদের শৈশবে সন্তোষালয়ের সামনেটা যে ছোট ছোট সাদা ফুলের গালিচা পাতা থাকত, তার নাম ‘‌হিমঝুরি’‌। সারারাত হিমের মতো ঝরতে থাকে। এর অন্য নাম ‘‌নিমচামেলি’‌। হলুদ রঙের ঘণ্টার মতো দেখতে এক রকম ফুলকে অনেক সময়েই পথেঘাটে দেখা যায়। বাড়ির বাগানে, পাঁচিলে অল্প যত্নে প্রচুর পরিমাণে ফুটে থাকে। এ যে ‘‌অলকানন্দা’‌ ফুল এবং রবীন্দ্রনাথেরই দেওয়া নাম, তা আজ জানা হল। একটি অনাদৃত বুনোফুলকে রবীন্দ্রনাথ জঙ্গল থেকে আনিয়ে বাগানে লাগিয়েছিলেন। তার নাম রাখলেন ‘‌বনপুলক’‌। এই ফুল সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, ‘‌এর গুচ্ছ কতকটা রঙ্গন ফুলের মতো, কিন্তু এ অন্য জাতের। এর গন্ধ কোমল অথচ ব্যাপক।’‌ এ বই না পড়লে এ তথ্য হয়তো অজানাই থেকে যেত!‌ কবির বন্ধু পিয়ার্সন উত্তরায়ণের উঠোনে একটি বিদেশি চারা পুঁতেছিলেন। বেশ কিছুদিন পর নীলচে বেগুনি ফুল ফোটে। ফুলের শোভায় মুগ্ধ হয়ে কবি নাম দিলেন ‘‌নীলমণি লতা’‌। বছর দুই আগে এন্ড্রুজপল্লিতে আমার বন্ধুর বাড়িতে নীলমণি লতার সম্ভার দেখে কেমন বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। নীলমণি লতার নেপথ্য কাহিনীও এই সবে জানলাম।
‘‌মধুমঞ্জরী’–‌‌কে নিয়ে কবি লিখলেন, ‘‌ওগো বধূ সুন্দরী, তুমি মধুমঞ্জরী/ ‌পুলকিত চম্পার লহো অভিনন্দন—’‌। থোকা থোকা সাদা মাধবীফুলের স্থায়িত্ব অল্পদিনের জন্য। কবি কি অনায়াসেই বললেন, ‘‌হে মাধবী দ্বিধা কেন/‌ আসিবে কি ফিরিবে কি।’‌ আর মালতী হল সাদা ও সুগন্ধী। অনেকটা শিউলি ফুলের মতো। ‘‌ওই মালতীলতা দোলে/ ‌পিয়ালতরুর কোলে পূব হাওয়াতে।’‌
আর যে ফুলের নাম না করলে এ লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, সেটি হল ‘‌সোনাঝুরি’‌। এর প্রকৃত নাম ‘‌আকাশমণি’‌। এ গাছ দেখলে মনে হয় সত্যিই যেন সোনা ঝরে পড়ছে। রবীন্দ্রনাথ একে ‘‌সোনাঝুরি’‌ আখ্যা দিলেন।
রবীন্দ্রনাথ শুধু ফুলের নাম রেখেই ক্ষান্ত হননি, তাদেরকে কবিতায়, গানে অমর করে গেছেন। শান্তিনিকেতনের ফুল আরও এক জায়গায় তাদের পরিচিতি বহন করে চলেছে, তা হল বাড়ির নামকরণে। শান্তিনিকেতনে এর দৃষ্টান্ত প্রচুর। এন্ড্রুজপল্লিতে এই রকম একটি বাড়ির নাম হল ‘‌গুলঞ্চ’‌। বাড়ির বাগানে গাছটি মধ্যমণি হয়ে বিরাজ করছে। ‘‌গুলঞ্চ’‌ নামটি রবীন্দ্রনাথের দেওয়া।
লেখক এখানে আরও অজস্র ফুলের বিষয়ে বিশদভাবে বলেছেন। পরিশেষে বলি, এই বইটি পড়ে ভাললাগায় মন আবিষ্ট হয়ে গেছে। সুন্দর প্রচ্ছদ, ভাল কাগজে ঝকঝকে ছাপা, ভেতরে অসংখ্য ফুলের অসামান্য আলোকচিত্র এবং সর্বত্র সুন্দর পারিপাট্য এই গ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ফুলের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা, নিবিড় অবলোকন ও নিখুঁত পর্যবেক্ষণ লেখককে এই কাজে সার্থক করেছে। শান্তিনিকেতনের অনেক বিরল গাছ ও ফুলের কথা তিনি জানিয়েছেন। জেনে নিজেকে সমৃদ্ধ মনে হচ্ছে। পরিশ্রমসাধ্য তাঁর এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। বইটির সর্বত্র লেখকের রবীন্দ্রমুগ্ধতা ও শান্তিনিকেতনের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ পেয়েছে। এই বই শুধু সংগ্রহযোগ্যই নয়, পড়ে ফেলাটাও আবশ্যক মনে হয়। ■
 

জনপ্রিয়

Back To Top