বিপ্লব সরকার
পশ্চিমবাংলার পাখি • ‌পর্ব:‌ হুগলি • অর্ণব নন্দী • বই কারিগর • ৯০০ টাকা‌
একটা সময় মনে করা হত, পাখি দেখা ছেলেখেলা। সময় নষ্ট। মনে করা হত, বিজ্ঞানে এর কোনও মূল্য নেই। ভারতীয় পক্ষীবিদ্‌দের কাজ ছিল শুধু গুলি করে পাখি মেরে নমুনা সংগ্রহ। আর পাখির বাসা থেকে ডিম সংগ্রহ। ব্যস্‌ এতেই পাখিচর্চার কাজ শেষ!‌ বই, পত্রিকা, বিভিন্ন জার্নাল এই ধারণা ধাপে ধাপে বদলে দেয়।  জার্ডন নামে এক পক্ষীপ্রেমী তাঁর ‘‌দি বার্ডস অব ইন্ডিয়া’য়‌ নতুন কথা শোনালেন। আলোচনা করলেন পাখিদের অভ্যেস, ডাক, আচরণ নিয়েও। পাখিপ্রেমীদের সামনে নতুন দুয়ার খুলে গেল। ব্রিটিশ পক্ষীবিদ্‌ অ্যালন অক্টোভিয়ান হিউম ভারতে পক্ষীচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। ভারতীয় পাখিচর্চা নিয়ে হিউম একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। নাম ‘‌স্ট্রে ফের্দাস’‌। ১৮৮৯–১৮৯৮ সালের মধ্যে ‘‌ভারতে প্রাণীকুল’‌ সিরিজের চারটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে ভারতীয় পাখিদের বিবরণ ছিল। বইগুলি লিখেছিলেন, ই ডবলিউ ওয়েটস‌, ডবলিউ টি ব্লানফোর্ড। এঁরা ছিলেন অতি–বিখ্যাত পক্ষীবিদ। এরপর রয়েছে সালিম আলির অজস্র লেখা, বই। 
এসবেরই পরম্পরা হিসেবে একটি বই হাতে এসেছে। আহ্‌ পাখিদের নিয়ে কতই তথ্য!‌ পাঠে চমকিত হতে হয়।   
হুগলির রাজারহাটে ময়ূর আটকে পড়ছে ফাঁদে। বালিহাঁস বাসা বাঁধে জলের পাশের ঘাস বনে। শব্দ পেলেই পানডুবি টুপ করে ডুব দেয় জলে। সবাই মিলে ঠিক করেছেন শামুকখোল বাঁচাতে হবে। কোর্চে বক ভিড় করেছে হুগলি স্টেশনের কাছে। ছোট পানকৌড়ি পাখনা মেলে জল শুকোয়। সুগন্ধা গ্রামের বাঁশবাগানে ডাকপাখিদের বিরাট আস্তানা। হুগলির নির্জন মজে যাওয়া সরস্বতী নদীর দু’‌পাশের বাগানে দেখা যায় কুবোকের। কুটুরে প্যাঁচার দেখা মেলে দিনের আলোয়। বসন্তবৌড়ি ধীর লয়ে ডেকে চলে একটানা। তালচটক তাল গাছে বাসা বাঁধে। তিলে মুনিয়া শস্যের শিষ থেকে বীজ কেটে খায়। এরকম প্রায় একশো পাখির ছবি আর কাণ্ডকারখানা নিয়ে চমৎকার বই করেছেন অর্ণব নন্দী। বইয়ের নাম ‘‌পশ্চিম বাংলার পাখি, পর্ব:‌ হুগলি’‌। ঝকঝকে তকতকে আর্ট পেপারে ছেপেছে ‘‌বই কারিগর’‌। প্রচুর পরিশ্রম করে কাজ করেছেন অর্ণব। হুগলি জেলার শহরে, গ্রামে–গঞ্জে, বনে–জঙ্গলে, নদীর ধারে, জলায়, আমবাগানে, ঘাসের ঝোপে, গাছের ফাঁকে ক্যামেরা তাক করে ঘুরে বেড়িয়েছেন দিনের পর দিন। এমনকি কবরস্থান, শশ্মানভূমিতেও গেছেন নিঃশব্দে। ধৈর্য্য, অধ্যবসায়, শিল্পের ছাপ বইটির পাতায় পাতায়। পাখিদের রূপের বর্ণনায় মুগ্ধ হতে হয়। অর্ণব যথার্থ অর্থেই একজন গুণী প্রকৃতিপ্রেমী। প্রকৃতিচর্চায় তাঁর নিবিড় আগ্রহ। পাখি দেখা আর তাদের ছবি তোলার নেশায় মেতে থাকেন। নিজের দেশ তো বটেই বিদেশ থেকেও পেয়েছেন স্বীকৃতি। এ সবের সঙ্গে তাঁর চমৎকার বাংলা গদ্যটিরও প্রশংসা করতে হয়। ৯৯টি প্রজাতির পাখি নিয়ে কাজ করেছেন। কারা নেই সেখানে?‌ পাতা ফুটকি, বাঁশপাতি, কণ্ঠিবাবুই, শ্যামসুন্দর, মাঠচড়াই থেকে শুরু করে হলদে মাথা খঞ্জন, সরমুনিয়া, লাল আবাবিল, কালো ঘাড় বেনেবৌ, কাজল পাখি। সাধারণত গবেষণার পত্রিকাগুলি খটমট ধরনের হয়। সাধারণ পাঠক ভিতরে ঢুকে রস পান না। বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক পরিভাষায় ভর্তি থাকে। অর্ণব এই বইয়ে সেদিকে নজর রেখেছিলেন। বইটি কখনোই ভারাক্রান্ত হয়নি। বরং পড়তে পড়তে মনে হয় হুগলির পাখিরা আমার আকাশে আসবে কবে!‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top