শবরী রায়: 

‘‌মেয়েদের বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না’‌— এই প্রবচনটি যে পাখি পড়ানো কৌশল এবং সর্বৈব মিথ্যে, তার প্রমাণ রেখেছেন পূর্ণা চৌধুরী তাঁর ‘‌গড়গড়ার মা’‌লো’‌ বইটিতে। ঊনবিংশ শতক থেকে বিংশ শতকের নারীর, পুরুষের সঙ্গে সমান্তরাল ইতিহাস গ্রন্থনার একটি গবেষণামূলক নজির এই বইটি।
জ্বলতে জ্বলতে কখনো কখনো নিভু নিভু হয় প্রদীপ৷ মেধা ও মননের প্রদীপও৷ তখন একটু উসকে দেওয়ার প্রয়োজন হয়৷ কোনও কোনও বইয়ের কাছে এমন কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে হয়৷ না পড়লে কি জানতাম? এই যে ‘‌হাতবিধবা’‌ শব্দটা, আগে শুনেছেন? আমি শুনিনি৷ সবাই কি সব কিছু জানে নাকি!‌ শীতল ষষ্ঠী, চাপড়া ষষ্ঠীর সঙ্গে পালিশ ষষ্ঠীর কথা শুনেছেন? আমি কিন্তু শুনেছিলাম৷ ভুলে গিয়েছিলাম৷ মনে পড়ল এগারো বছরের জন্মদিনে উপহার পাওয়া বঙ্কিমের সরস গল্প বইটির কথা৷ ওখানেই ছিল রামী ও বামীর বসন্তবর্ণনা৷ আইসো আমরা বসন্ত বর্ণনা করি৷ একজন বলছে মলয় মরুৎ মৃদু মৃদু প্রধাবিত, অপরজন বলছে তদবাহিত ধুলায় দন্ত কিচকিচিত৷ ওই বইতেই আছে৷ হা ডু ডু৷ অর্থাৎ হাউ ডু ইউ ডু৷ উচ্চারণের সময় এমনই হবে৷ মেয়েমানুষের বুদ্ধি কোনও কালেই সুবিধের নয় যে। 
‘‌আমরা evidence এবং authority দুই–‌ই মানি। সেই কবে শুনেছি, নারী বুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী। কিন্তু প্রলয়টি যে কোন রূপে আসবে, সেটি অবশ্য এই প্রবচনটি থেকে বোঝার উপায় নেই।’‌ পূর্ণা চৌধুরী লিখছেন, ‘‌‌মেয়েমানুষের বুদ্ধি’‌ এই পরিচ্ছদে। পরিচ্ছেদের নামগুলি চিত্তাকর্ষক। যেমন, মিনসেদের পালিশ ষষ্ঠী অথবা মেয়েলি বুলি, বেশ্যা পুরাণ, তার ঠিক পরেই বাবু বৃত্তান্ত। অথ গোলাপ বিনোদ কথা, শিক্ষিতা পতিতা ও স্বদেশী বাবুবিচার, শিক্ষিতা স্ত্রী অথবা পাস করা মাগ, পুত্রোৎপাদিকা বনাম নভেল নায়িকা, ধেড়ে মেয়ের লেখালিখি ইত্যাদি।  শিরোনামের শ্লেষ, কৌতুক জ্বালা কোন অবলাদেরই বা বিদ্ধ করবে না? প্রতিটি পরিচ্ছদ মানানসই এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। অবলা এবং অবলা নামের আড়ালে অবলাবান্ধবরাও লিখেছেন বইকি।
পূর্ণা চৌধুরী লিখছেন, ‘‌একখানি নতুন কথা শিখলাম এইসব যাদের নাম–‌নিতে–‌নেই, তাদের উচ্চভাব নাড়াচাড়া করার সুবাদে৷ কথাটি হল, ‘‌হলদে ভাতার’‌৷ এও জানলাম, ইনি হলেন বিশেষ ভালোবাসার মানুষ৷ এনার জন্যে ঘি দিয়ে ভাত রাঁধা হয়৷ কিন্তু আমি দেখতে পেলাম বংশীধারী পীতাম্বরকে৷ অনেক পতিতাই সেইরকম একজনকেই খুঁজে বেরিয়েছে হয়তো, মুখে স্বীকার করেনি সে হাপসী মাধাই বা বকনা পিয়ারীদের ভয়ে কিনা কে জানে!’‌
‘‌হাত ঝাড়লেই পর্বত’‌ এই প্রবাদ প্রবচনটি শুনেছেন? দেওয়ানচি, বুব্বুলিয়াদের সম্পর্কে জানেন? আঠারশো শতকে তৈরি হওয়া সমাজের শ্রেণীচরিত্র মনে আছে তো? বঙ্কিমের লোকরহস্য থেকে পূর্ণা তুলে দিয়েছেন, ‘‌যাঁহার বাক্য মনোমধ্যে এক, কথনে দশ, লিখনে শত এবং কলহে সহস্র তিনিই বাবু, যাঁহার বল হস্তে একগুণ, মুখে দশগুণ, পৃষ্ঠে শতগুণ এবং কার্যকালে অদৃশ্য তিনিই বাবু... যাঁহার স্নানকালে তৈলে ঘৃণা, আহারকালে আপন অঙ্গুলিকে ঘৃণা এবং কথোপকথনকালে মাতৃভাষাকে ঘৃণা তিনিই বাবু৷...‌’‌ আরও কত কি...‌
উসকে দিয়েছেন পলতে, আমি উলটে চলেছি৷ মেয়ে মানুষের ফাঁদি নথ আঁঁকশি হয়ে পুুরুষমানুষকে নাকানিচোবানি খাইয়ে ছাড়ে৷ মদ কোন রাস্তায় এসে বাবুসমাজে জায়গা করে নিল, ১৮৬০ সালে বটতলায় ছাপা হরিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘‌কলির রাজ্যশাসন’‌ ছড়াকারে তা দেখাচ্ছে। আবার বঙ্কিমচন্দ্রের বাবুতত্ত্বের ছেঁদাও দেখা যাচ্ছে৷ এইসময় পিলপিল করে কিছু বাঈজি বারাণসী, লক্ষ্ণৌ, মহিশূর, মুর্শিদাবাদ থেকে এসে জড়ো হয়েছেন। এসেছেন সাহেবদের তাড়া–‌খাওয়া গুটিকয়েক নবাব সুলতান গোছের লোক৷ মাসমাইনের বাঁধা হাজার টাকার নিক্কিবাঈ থেকে শুরু করে হরিমতি বাঈ কিম্বা দেবী বাঈয়ের মতো কিছু হিন্দু মেয়েও বাঈ হিসেবে নাম কিনেছিলেন। এছাড়াও ছিল বাড়ির নিকট এবং লতায় পাতায় নিরাশ্রয় অনাথ বিধবা এবং পতিপরিত্যক্তা সধবারা৷ এছাড়াও উড়েনি, নাপতিনি, মালিনী, নেড়ি (বোষ্টমী) দাসীরূপাদের শরণাপন্না হতেন এক্সেস সাপ্লাইয়ের জন্য। কলকাতার বাজারে যেন আর লঘুগুরু রইল না৷ লেখিকা পরিসংখ্যান দিচ্ছেন, ‘‌অন্দরমহলের ১৮৫৩–‌র হিসাব অনুযায়ী কলকাতা শহরে তখন সাড়ে চার লক্ষ জনসংখ্যার বারো হাজারই বেশ্যা। তার মধ্যে দশ হাজারের কাছাকাছি কুলীন সধবা অথবা অল্পবয়সী বিধবা৷ অন্দরমহলের এনারা হলেন নন রেজিস্টার্ড উদ্বৃত্ত।’‌
কেন পড়বেন? ওই যে প্রথমেই বললাম, নিজেকে উসকে দেওয়ার জন্য৷ আলো খুঁজে পাবেন৷ অন্ধকারও৷ হাতড়ে নিজেই আর একটা সলতে জ্বালাতে পারবেন৷ তেমন কল্পনাশক্তি থাকলে আপনিও লিখে ফেলতে পারেন এক ঐতিহাসিক উপন্যাস। পাঠক আপনি যদি অবলা হন, তাহলেও পড়ুন, অবলাবান্ধব হলে তো পড়বেনই, সবল এবং সবলারাও পড়ে দেখতে পারেন৷ উপহার দিতে পারেন৷ একটি সংগ্রহযোগ্য বই৷ হাতে নিয়ে সুন্দর অনুভূতি হল৷ পার্থ দাশগুপ্তর প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ যথাযথ এবং দৃষ্টিনন্দন৷ বইটিকে একটি অ্যালবামও বলা যেতে পারে। প্রকাশক সামরান হুদা তথা ৯ঋকাল বুকস৷ ■ 

গড়গড়ার মা’‌লো ‌• পূর্ণা চৌধুরী • ৯ঋকাল বুকস • ৫০০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top