উনিশ শতকের বাংলা সংবাদ–‌সাময়িকপত্র স্বপন বসু • পুস্তক বিপণি • ১৫০০ টাকা
উনিশ শতক বিষয়ে গবেষণায় স্বপন বসু একালের এক সমাদৃত নাম। বিশেষত বাংলা সংবাদ–‌সাময়িকপত্র সম্পর্কে তাঁর শ্রমসাধ্য সঙ্কলনগুলির সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে তাঁরা স্বীকার করবেন, এ ধরনের কাজে তিনি যেভাবে নিষ্ঠার ও অধীতির প্রমাণ দিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার্হ। দীর্ঘ প্রায় চল্লিশ বছর তিল তিল করে সংগৃহীত উপাদানের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা একটি বৃহদায়তন গ্রন্থ— ‘‌উনিশ শতকের বাংলা সংবাদ–‌সাময়িকপত্র’‌। এ বিষয়ে পূর্বে আমরা অনেকেরই বই পড়েছি— কিন্তু কোনওটিকেই পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হিসেবে অভিহিত করতে পারিনি। এতদিনে সেই অভাব পূরণ হল। লেখক ‘‌নিবেদন’‌–‌এ লিখেছেন:‌ ‘‌উনিশ শতকের সংবাদ–‌সাময়িকপত্রের সামগ্রিক একটি পরিচয় তুলে ধরার এটি একটি বিনীত প্রয়াস। এই প্রয়াস কতখানি সফল হয়েছে তা বিচারের ভার সহৃদয় পাঠকসমাজের।’‌ সরকারি নথিপত্র, রিপোর্ট;‌ উনিশ শতকে প্রকাশিত বাংলা–‌ইংরেজি পত্রিকা যেগুলি আজও পাওয়া যায়;‌ পূর্ববর্তী গবেষকদের গবেষণাকর্ম;‌ বিপোর্ট অন নেটিভ পেপার্স;‌ পত্র–‌পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ, বিজ্ঞাপন;‌ বিভিন্ন মানুষের আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা ছাড়াও লং, ওয়েঙ্গার, মার্ডক, ব্লুমহার্ড প্রভৃতির পুস্তক তালিকা ও বেঙ্গল লাইব্রেরি ক্যাটালগ থেকে সমাহৃত বিপুল তথ্যভাণ্ডারে সমৃদ্ধ এ বইকে সংক্ষেপে আকর পরিচয়ে অভিহিত করাই সমীচীন। দুই বাংলার লব্ধপ্রতিষ্ঠ সংগ্রহশালা, গ্রন্থাগার, অভিলেখ্যাগার ছাড়াও নতুন দিল্লির জাতীয় অভিলেখ্যাগার ঘুরে ঘুরে তিনি যে সব ছবি আলোচ্য গ্রন্থে যুক্ত করেছেন তাতে আকর্ষণ ও মর্যাদা অবিসংবাদিতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু মুদ্রিত যাবতীয় নথি ও ছবির একটা তালিকা উল্লিখিত থাকলে বইটি ব্যবহার করার সুবিধা হত।
বইটির চতুর্থ মলাটে জানানো হয়েছে:‌ ‘‌সংবাদ–‌সাময়িকপত্র সমাজের আয়না। সেই আয়নায় প্রতিফলিত উনিশ শতকের বাঙালির আশা–‌আকাঙ্ক্ষা, সুখ–‌দুঃখ, হতাশা–‌বঞ্চনা।’‌ আলোচ্য বই বিন্যস্ত হয়েছে মোট আটশো সাতাশ পৃষ্ঠায়। তার মধ্যে একশো পঁয়ত্রিশ পৃষ্ঠার পরিসরে লিখিত হয়েছে যে তথ্যসমৃদ্ধ ‘‌ভূমিকা’‌ সেটি পড়লে বর্তমান অনুচ্ছেদের উদ্ধৃত অংশটির যাথার্থ বোঝা যায়।‌ ‘‌ভূমিকা’‌য় বিবৃত দশটি পৃথক শিরোনামে যে অধ্যায়, তার প্রতিটিই অত্যন্ত সুখপাঠ্য ভাষায় লেখা। ‘‌বাংলা সংবাদ–‌সাময়িকপত্রের ইতিহাস রচনার ধারা’‌ থেকে শুরু করে শেষতম অধ্যায়টি সবচেয়ে বড়, প্রায় চুয়ান্ন পৃষ্ঠার— ‘‌জনমত গঠনে সংবাদ–‌সাময়িকপত্রের ভূমিকা’‌ পাঠ করলে লেখকের বিশ্লেষণে যে অনপেক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায় তা নানা দিক থেকেই মূ্ল্যবান।
১৮১৮–‌র এপ্রিল মাসে শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত হয় দিগদর্শন, তারপর সেই ধারায় পরবর্তী অনধিক আট দশক ধরে মোট বারোশো দুটি পত্রিকার উল্লেখ এবং সেগুলির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখা হয়েছে— ‘‌বাংলা পত্রিকার জগৎ’‌ বইয়ের দ্বিতীয় পর্বে— পাঁচশো তিরাশি পৃষ্ঠার পরিসরে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে— পত্রিকার কালানুক্রমিক পরিচিতি, যে জন্য আয়ু, চারিত্র এবং সমাজজীবনে প্রভাবের নিরিখেই সেগুলির ইতিহাস আনুপাতিকভাবে ছোট‌–বড় হয়েছে। পত্রিকাগুলির বিষয়‌বৈচিত্র‌্যও বিস্ময়কর— সংবাদ, সাহিত্য, ধর্ম, ইতিহাস, পুরাবৃত্ত, নারী উন্নয়ন, বিদ্রুপাত্মক, শিশু–‌কিশোরপাঠ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, খেলাধুলা, জাদুবিদ্যা, বিনোদন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সভা–‌সমিতির মুখপত্র— আরও কত কী। ‘‌কণ্ঠরোধের রাজনীতি ও বাংলা সংবাদপত্র’‌, ‘‌বাংলা গদ্যের বিবর্তন— সংবাদ–‌সাময়িকপত্রের ভূমিকা’‌, ‘‌সম্পাদক প্রসঙ্গে’‌ প্রভৃতি ‘‌ভূমিকা’‌ অংশের অধ্যায়গুলি আমাদের অনেক কৌতূহল নিরসনের সহায়ক।
গ্রন্থের শেষের দিকে সংযুক্ত গ্রন্থপঞ্জি, নির্দেশিকা, ইত্যাদি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে প্রস্তুত হওয়ায় সাধারণ পাঠক থেকে গবেষক যে কেউ এটি সহজে ব্যবহার করতে পারবেন। অনেক সময় আমরা একটি শিরোনাম দেখে বেশ ধন্দে পড়ি— অভিধা নির্ধারণে, ‘‌বই না পত্রিকা?‌’‌ শিরোনামে লেখক সে বিষয়েও সুচিন্তিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। একেবারে শেষের দিকে তিনি আরও একটি যত্নশীল অধ্যায় যোগ করেছেন— ‘‌যে সব পত্রিকার কথা বিজ্ঞাপিত বা প্রচারিত হয়েছিল, কিন্তু প্রকাশিত হবার কথা জানা যায়নি’‌ শীর্ষকে।
উনিশ শতকের সেই দূর অতীতে যে চর্চার সূত্রপাত— কালক্রমে তার বিস্তার ঘটেছিল— শ্রীরামপুর আর কলকাতা ছাড়িয়ে মুর্শিদাবাদ, রংপুর, বর্ধমান, মেদিনীপুর, ঢাকা, যশোর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম থেকে হুগলি, হাওড়া, নদিয়া, চব্বিশ পরগনা, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মালদা, দিনাজপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি— আজও শত জল ঝর্নার ধ্বনিতে দুই বাংলার দশদিগন্ত মুখরিত হয়ে সেই ধারা প্রবহমান।
বর্তমান গ্রন্থের পরিচয়–‌লিপির কিছুটা অংশ উদ্ধৃত করলে বোঝা যাবে উনিশ শতকের সংবাদ–‌সাময়িকপত্র সত্যি কী ভূমিকা পালন করেছিল:‌ ‘‌শুধু খবর নয়। গদ্যের স্বচ্ছন্দ গতি। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নির্মাণ। নতুন লেখক তৈরি। মেয়েদের কলম হাতে তুলে নেওয়ার সাহস। বাঙালি মুসলমানের এদেশকে জন্মভূমি এবং বাংলাকে মাতৃভাষার স্বীকৃতি। সব কিছুই হয়েছে বাংলা সাময়িকপত্রের পাতায়। সামাজিক অবিচার–‌অত্যাচার। অর্থনৈতিক শোষণ। রাজনৈতিক আগ্রাসন সব কিছুর বিরুদ্ধে সরব উনিশ শতকের সংবাদ–সাময়িকপত্র।’‌ তথ্য–‌প্রমাণাদির দৃষ্টান্তে রচিত এ বই তাই একটি অভিনন্দনযোগ্য প্রয়াস।‌‌‌‌‌‌ ■

 

 

রাজদ্রোহের দায়ে অভিযুক্ত ‘‌বঙ্গবাসী’‌র চার কর্মকর্তা। বাঁদিক থেকে কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (‌সম্পাদক), ব্রজরাজ বন্দ্যোপাধ্যায় (‌ম্যানেজার)‌, যোগেন্দ্রচন্দ্র বসু (‌স্বত্বাধিকারী)‌, অরুণোদয় রায় (‌প্রিন্টার)। ছবিটি বই থেকে সংগৃহীত।
 

জনপ্রিয়

Back To Top