সুমিতা চক্রবর্তী: কোনও কোনও মানুষ থাকেন যাঁরা জীবৎকালেই কিছুটা কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। তাঁদের জীবনকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে কিছু গল্প‌কথা। অনেকটাই সত্য;‌ কিছু হয়তো একটু অতিরঞ্জিত।  কিন্তু তার মধ্যেই থেকে যায় সত্যের নির্যাস। নাম শরৎচন্দ্র পণ্ডিত, জন্ম ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে। বীরভূমের একটি গ্রামে। প্রয়াণ ১৯৬৮–‌তে। মানুষটি সাধারণ পাঁচজনের মতো ছিলেন না। স্বাতন্ত্র্য বিচ্ছুরিত হত তাঁর জীবনাচরণে, কাজে, ন্যায়বোধে এবং রসবোধে। একদিকে ছিলেন সহৃদয়, পরোপকারী, সরল মানুষ। অন্যদিকে ছিলেন সামাজিক স্খলনের প্রতিবাদে ক্ষুরধার এবং সরস ব্যঙ্গের ভাষায় সুনিপুণ। দাদাঠাকুর বিশেষণেই তাঁর পরিচয়।
তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনা করেছেন হাসির গানের লেখক এবং গায়ক নলিনীকান্ত সরকার। বইটির নাম ‘‌দাদাঠাকুর’‌। আরও অনেকের স্মৃতিতে ধরা আছে তাঁর ছবি। উল্লেখযোগ্য একটি বই লিখেছেন তরুণ চক্রবর্তী— ‘‌কথাসাগরেষু’‌। ধরা–‌বাঁধা জীবনী নয়। জীবনপঞ্জি ছড়িয়ে আছে ইতস্তত কিন্তু প্রধানত সঙ্কলিত হয়েছে দাদাঠাকুর সম্পর্কে অজস্র কাহিনি। সেই সঙ্গে তাঁর বিদগ্ধ শব্দ–‌খেলা এবং সরসোক্তি অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘‌পান’‌ (‌Pun)‌‌ এবং ‘‌উইট’‌ (‌Wit)‌— এই দুইয়ের সমন্বয়ে তাঁর স্মরণীয় বাক্‌–কলা উঠে এসেছে বইটিতে। এখানেই বইটির প্রধান আকর্ষণ। সঙ্গে আছে দাদাঠাকুরের চরিত্রের তেজ‌দীপ্ত প্রসন্নতার ঝলক। 
তবু জীবনতথ্যগুলি জেনে নেওয়া যাক। পিতা হরিলাল পণ্ডিতের আদিবাস ছিল বীরভূমের ধরমপুর গ্রামে। পরে চলে আসেন মুর্শিদাবাদের দহরপুরে। শৈশবে অনাথ শরৎচন্দ্র জঙ্গিপুরে কাকা রসিকলালের কাছে মানুষ হয়েছিলেন। মেধা ও স্মরণশক্তি ছিল তীক্ষ্ণ। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বর্ধমান রাজ কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে কলেজের পড়া চালাতে পারেননি। স্থির করলেন গ্রামে ছাপাখানা বসিয়ে এবং পত্রিকা সম্পাদনা করে সংসার নির্বাহ করবেন। সব কিছু নিজেই‌ করতেন— কম্পোজ করা, প্রুফ দেখা, মুদ্রিত কপি বের করা এবং নিজের হাতে পথে পথে ঘুরে পত্রিকা বিক্রি করা। নিশ্চয়ই কষ্টের জীবন;‌ কিন্তু সমস্ত বাংলা জুড়ে তাঁর এত খ্যাতি হল কীভাবে;‌ সেই কাহিনিই ধরা আছে ‘‌কথাসাগরেষু’‌ বইটিতে। 
‘‌জঙ্গীপুর সংবাদ’‌ নামের সাপ্তাহিক পত্রিকায় সবরকম অন্যায়কে আঘাত করতেন তিনি। তাঁর সম্পাদিত আর–একটি পত্রিকা ছিল ‘‌বিদূষক’‌—রঙ্গব্যঙ্গের ভাষায় সেখানেও সত্যকে প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। বোতলের আকারে এক–‌একটি সঙ্কলন মাঝে মাঝে প্রকাশ করতেন— নাম ছিল ‘‌বোতলপুরাণ’‌। সংসারে স্বচ্ছলতা ছিল না কিন্তু কখনও কারও কাছে মাথা নত করেননি। শাসক–‌শক্তি থেকে প্রভাবশালী বিত্তবান— সমালোচনার তীর ছুঁড়ে দিতেন সকলের দিকেই। অতিসাধারণ ধুতি–‌চাদর পরিহিত‌ মানুষটি তখনকার রাজ্যপাল থেকে শুরু করে দরিদ্র গ্রামবাসীদের কাছেও ছিলেন সমান শ্রদ্ধেয়।
তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বার একটি কারণ অবশ্য ছিল কলকাতা বেতার–‌কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘকালের সম্পর্ক। সেই সূত্রে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, রাইচাঁদ বড়াল, কাজী নজরুল ইসলাম, পঙ্কজকুমার মল্লিক, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠজন। প্রমথনাথ বিশী তাঁকে বলেছিলেন এ যুগের শ্রেষ্ঠ হিউমারিস্ট। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সমকালের সাহিত্যিক এবং সঙ্গীতশিল্পীদের সঙ্গে তাঁর ছিল সমানে–‌সমানে বন্ধুত্ব। ভাষার ওপর ছিল অসাধারণ দখল। যে কোনও আড্ডায় ছিলেন মধ্যমণি। সে গল্প সবারই জানা— শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘‌দাদাঠাকুর’‌–‌কে দেখে বললেন— এই যে ‘‌বিদূষক শরৎচন্দ্র’‌। দাদাঠাকুর–‌এর উত্তর ছিল— এই তো দেখছি ‘‌চরিত্রহীন শরৎচন্দ্র’‌। 
অজস্র এমন সত্য গল্পে— পরিপূর্ণ এই ‘‌কথাসাগরেষু’‌ বইটি। একটিমাত্র ঘটনা উল্লেখ করে তাঁর কথা আপাতত শেষ করা যায়। একবার রেডিওতে ফ্যাশন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আধুনিকা মায়েদের সম্পর্কে ঈষৎ কটাক্ষ করেছিলেন দাদাঠাকুর। প্রচুর সমালোচনা হল। অধিকর্তা স্টেপ্‌লটন সাহেব ডেকে পাঠালেন। ধুতি–চাদর পরিহিত দাদাঠাকুরকে দেখে প্রথমে বললেন, ‘‌‌দিস ইজ ইওর ফ্যাশন?‌‌’‌
তারপর দাদাঠাকুরকে বললেন ‘‌ফ্যাশন’‌ শব্দের সংজ্ঞা দিতে। দাদাঠাকুর লিখে দিলেন— ‘‌‌ফ্যাশন ইজ দ্য থিং দ্যাট অ্যারাউজেজ প্যাশন অফ দি আদার সেক্স।‌’‌ সেকালের সাহেবরা অনেকেই গুণের কদর করতেন। এই উত্তর শুনে সাহেব তাঁর পারিশ্রমিক দশ টাকা বাড়িয়ে দিলেন এবং নির্দেশ দিলেন প্রতি মাসে যেন অন্তত চারটি অনুষ্ঠান তাঁকে দেওয়া হয়। 
তবু সব কিছুর পরেও আমার একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন আছে। তিনি চটি বা জুতো পায়ে দিতেন না। হওড়া স্টেশন থেকে নগ্নপদে— নিজেকে বলতেন খলিফা (‌খালি পা)‌— হেঁটে আসতেন তখনকার বেতার–‌কেন্দ্র গর্স্টিন প্লেসে। প্রশ্নটি এখানেই, বিলাসবর্জন করবার সঙ্গে পায়ে চটি না পরার কি সত্যিই সম্পর্ক আছে?‌ খালি পায়ে শহরে–‌বাজারে পথচলা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। বিলাসবর্জনের একটু অহঙ্কারও ছিল দাদাঠাকুর–‌এর চরিত্রে। কোনও অহঙ্কারই পুরোপুরি যুক্তি‌সম্মত হয় না। তবে অনেকটা এই অহঙ্কারের শক্তিতেই আজও তিনি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছেন— একথাও সত্য।‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top