লোপামুদ্রা ভৌমিক‌‌‌: পুরাণ থেকে বর্তমান। নারীর অবস্থানের অদলবদল হয়নি খুব একটা। বদল ঘটেছে চাকচিক্যে। বাইরের আতিশয্যে। কিন্তু ভেতরে রয়ে গেছে সেই একই কাহিনির চাপানউতোর। সেখানে দুঃখ, যন্ত্রণা, অবহেলা, লাঞ্ছনার ইতিবৃত্ত। আসলে চিরকালই নারীকে কেবল নারী ভাবতেই ভালবেসে এসেছে সমাজ। তার মানবীসত্তায় বড় আপত্তি। তাই নারী আর্য হোক বা অনার্য— জীবনচরিতে একই আলোছায়া। কিন্তু এত অবহেলার পরও কিছু নারী মহাকাল পেরিয়েও থেকে গেছেন উজ্জ্বল। কারণ, কাল থেকে কালান্তরে তাঁরা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী, প্রতিবাদী এবং অনন্যা। তুলসী, শূর্পণখা, গান্ধারী, কুন্তী, উলূপী বা খনার মতো নারীরা নিজেদের ব্যক্তিত্বে হয়ে উঠেছেন মানবী। তাঁদের মর্মকথায় পুরুষশাসিত সমাজের হাজারও আঁকিবুকি। তবু সব কিছুকে আত্তীকরণ করেও নিজেদের এঁরা করে তুলতে পেরেছেন অসাধারণ। এই ছয় নারীর গোপন কথায় কান পেতেছেন জয়তী রায়। দুই প্রচ্ছদে বন্দি করেছেন তাঁদের জীবনকথা। শিরোনাম ‘‌ছয় নারী!‌ যুগান্তকারী’‌। পেশায় মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতা হওয়ায় পুরাণ–নারীদের মনের কথাটি জয়তী পড়ে ফেলেছেন অবলীলায়। সেখানে যে কান্নার প্লাবন তা যেন প্রতিবাদের অক্ষরে মুছিয়ে দিতে চেয়েছেন লেখিকা। কখনও–বা এই ছয় নারীর ক্রোধের আগুনে পোড়াতে চেয়েছেন সমাজের অকথিত ঔদ্ধত্যকে। এই ছয় নারী যেন নিজেদের অজান্তেই একটি দীর্ঘ সময়ের কথা বলে যান। কখনও বিদূষী খনাকে দশম রত্ন দেওয়ার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে হত্যা করে তাঁর স্বামী–শ্বশুর। কোথাও অন্ধ ক্ষমতাশালী ধৃতরাষ্ট্রকে বিবাহের প্রতিবাদে গান্ধারী নিজের চোখে বেঁধে নেন সাত পুরু কাপড়। আবার কোথাও–বা তুলসীর স্বামী জলন্ধরকে হত্যার চক্রান্ত করতে তুলসীর সতীত্ব হরণ করেন তাঁরই আরাধ্য দেবতা। এই ছয় নারী যেন কেবল পুরাণ, মহাকাব্য নয়। জীবনের প্রাত্যহিকতায় জড়িয়ে আছেন রক্তমাংসে। বইয়ে ছয় নারীর জীবনালেখ্য ছটি প্রচ্ছদে বিবৃত হলেও মনে হয়েছে তা যেন একই সরলরেখায় চালিত। ছয় নারী যেন একটিই চরিত্র। যে শুনিয়েছে এক অনিঃশেষ লড়াই এবং প্রতিবাদের কথকতা। কুর্নিশ জয়তী। ■

জনপ্রিয়

Back To Top