সোহরাব হোসেন বয়সে আমার চেয়ে ছোট। তবু ওকে আমি ঈর্ষা করতাম। প্রায় কুড়ি বছর আগে সিউড়ির ‘‌গল্পসরণি’‌ সাময়িক পত্রে সোহরাবের একটা গল্প পড়েছিলাম। ‘‌বায়ুতরঙ্গের বাজনা’‌। সে–এক স্বপ্নের গল্প। যা আমি কোনওদিন লিখতে পারব না, অথচ লেখার স্বপ্ন যাপন করে যাব আমৃত্যু, আর পাঁচজন গল্পকারের মতো। গত মার্চের এক সন্ধ্যায় সোহরাব পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে, এই জানুয়ারিতে ওকে নিয়ে সংখ্যা বার করেছেন অমর দে, গল্পসরণির সম্পাদক। সেই ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে স্বাগত জানাব কী, পাতা উল্টে সোহরাবকে নিয়ে বিভিন্ন জনের স্মৃতিচারণ পড়তে পড়তে অবসাদে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে মন।
সোহরাবের ‘‌বায়ুতরঙ্গের বাজনা’‌ বা ‘‌দোজখের ফেরেস্তা’‌র মতো গল্প লিখতে যে কোনও গল্পকারই চাইবেন। কিন্তু পারবেন কি?‌ সোহরাব ছিল সহজাত লেখক। উপন্যাস লিখত, কবিতাও লিখত, প্রবন্ধ, গবেষণার দিকেও চলে গিয়েছিল পরের দিকে, এমনকি প্রশাসনেও। সৃজনশীল লেখা ছেড়ে এমন জগতে চলে যাওয়া আমাদের মতো অনেকেরই পছন্দ হয়নি। ওর উপন্যাস ‘‌মাঠ জাদু জানে’‌ আর ‘‌বদলি বসত’ পড়েছিলাম মন দিয়ে।  মনে হয়েছিল আমাদের এই পরিবর্তমান সময়টাকে সোহরাব কী নিখুঁত অনুভব করে, আর সেই অনুভব লেখার মধ্যে ফুটিয়ে তোলে নিজস্ব গদ্যে। উপন্যাসের ক্ষেত্রে সেই গদ্যে আর একটু সংগঠন টের পেলে ভাল লাগত।
কেন যে সোহরাব সৃজনশীল লেখা কমিয়ে গবেষণা আর প্রশাসনে মন দিল, সে–কথা কখনও ওর কাছেই জানতে চাইব ভেবেছিলাম। সেই অবকাশ পাওয়ার আগেই খবর পেলাম, সোহরাব অসুস্থ, এক আরোগ্যহীন ব্যাধিতে আক্রান্ত। আমার জন্মের চার বছর পর পৃথিবীর আলো দেখা সোহরাবের ব্যাধির খবর আমাকে বিমর্ষ করেছিল। তখন মন থেকে উধাও হয়ে গেছে সেই ঈর্ষা, যা আমি যাপন করেছি দীর্ঘদিন, ১৯৯৯ সালে সোহরাব সোমেন চন্দ পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে।
সোহরাবের বাস্তবতাবোধ আর কল্পনাশক্তি, দুটোই ছিল অসাধারণ, যা না থাকলে কেউ লেখক হতে পারেন না। সেই সোহরাব মাত্র পঞ্চাশ–উত্তর জীবনে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল, রবিশঙ্কর বল, আফসার আমেদ, অমিতেশ মাইতির মতো লেখা নিয়ে নিজেদের যাবতীয় স্বপ্ন আর পরিকল্পনা মুলতুবি রেখে। কী অসাধারণ দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্মেছি যে, এই সব বন্ধু, লেখকদের প্রত্যেকের মৃত্যুসংবাদ আমাকেই অব্যাহত লিখে যেতে হয়। ■
গল্পসরণি/‌সোহরাব হোসেন সংখ্যা • সম্পাদক অমর দে • ২০০ টাকা‌‌‌‌
অনিশ্চয় চক্রবর্তী
 

জনপ্রিয়

Back To Top