সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী

কিছু মুহূর্ত কিছু আশ্রয় • রুশতী সেন •‌ 
এবং মুশায়েরা •‌ ২৫০ টাকা
কথা ষোলো ধারায় বয়। অন্তত বইতে চায়। ‘‌অরণ্যের দিনরাত্রি’‌ ছবিতে শব্দের খেলার দৃশ্যখণ্ডটির কথা কেউ স্মরণ করতে পারেন। সেটা ছিল খেলা, কিন্তু কথাটা তো ঠিক, পাঁচজনের আসরে কথার পিঠে কথা আসে, এমনকী একটি শব্দমাত্রও খুলে দিতে পারে নতুন মুখ, আর কোথা থেকে যে কোথায় চলে যায় কথা!‌ একা–‌মনের যে আলাপ, সেখানেও এপাশে–‌ওপাশে কত না খাত। কথা বা চিন্তা বয়ে যেতেই পারে। কিন্তু সামনে শ্রোতা এসে দাঁড়ালেই যেন গোছগাছের দায়। তাতে ছিরি চাই, ছাঁদ চাই, মূল কথাটার একটি ধারা চাই, একটু এদিক–ওদিক গেলেও মূলের সঙ্গে শৃঙ্খলিত হওয়া চাই। লেখালেখি তাই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠতে চায় বাঁধাছাঁদার কারবার। 
বাঁধাছাঁদার শর্তটা প্রবন্ধের ক্ষেত্রে একটু বেশিই যেন বলবৎ। সেটা মাথায় থাকে বলেই রুশতী সেন তাঁর সঙ্কলনের গোড়াতেই জানান, এ–‌বইয়ের চোদ্দোটি লেখার অনেকগুলোই ‘‌যুক্তিবদ্ধ প্রবন্ধের চলন’‌ মানেনি। বহু ক্ষেত্রেই ‘‌ব্যক্তিক–‌নৈর্ব্যক্তিক’‌ মিলে–‌মিশে যায়। কথাগুলো বলেন লেখক খানিকটা অ্যাপলজির ভঙ্গিতেই। কিন্তু পাঠক তাতে উৎসাহিতই হবেন। কবিতা, উপন্যাস বা মেয়েদের কিছু আপন কথা, নাটক বা সিনেমা— কোনও টেক্সট বা শিল্পকর্মের এই সব ‘‌প্রতিক্রিয়া’‌য় অন্তরঙ্গ একটি পাঠ যদি তৈরি হয় ক্ষতি কী?‌ পাঠক নিজের লেনদেনের অভিজ্ঞতাকেও আশ্রয় করার ভরসা খুঁজতে পারেন ওই ‘‌ব্যক্তিক’ পরিসরটুকুতে। 
ব্যক্তিক থেকে নৈর্ব্যক্তিকে সরতে সরতেই ‘‌কবিতার কাছে’‌ হয়ে ওঠে বুঝি বা ডাইগ্রেশনের শিল্প। আবার মণীন্দ্র গুপ্তের ‘‌নুড়ি বাঁদর’‌ পড়তে পড়তে যে ধীরেন বলের তুতু–‌ভুতু–‌র স্মৃতিতে চলে যাওয়া যায়, তার হদিশ দেয় ‘‌এলোমেলো কল্পনার কাছে’‌। তবে পাঠক এটাও বোঝেন, শেষ পর্যন্ত কথার ধারাগুলো বিনুনির সৌষ্ঠব পেয়ে যায়। প্রবন্ধের যা দস্তুর। যদিও লেখকের নিজের বিচারে ‘‌এ মোহ আবরণ.‌.‌.‌’‌ ছাড়া এই গ্রন্থের আর কোনও লেখাই পুরোপুরি প্রবন্ধের চলন মানেনি। ‘‌এ মোহ আবরণ.‌.‌.‌’–‌এর বিষয় মেয়েদের স্মৃতিকথা। যাকে বলে অবশ্যপাঠ্য একটি রচনা। তবে, ‘‌পুরোপুরি ‌প্রবন্ধ’‌ না হলেও ‘‌এ মোহ আবরণ.‌.‌.‌’–‌এর সম্প্রসারণ হিসেবেই পড়ে নেওয়া যায় ‘‌বাপ রে কি ডানপিটে মেয়ে!‌’‌, ‘‌সুর–‌বেসুরের জীবনযাপন’–‌এর মতো ‘‌না–‌বুক–‌রিভিউ’‌, এমনকী ‘‌গানের কাছে’‌‌ও। 
পাঁচরকম লেখালেখি, শিল্পকলার সঙ্গে লেনদেনের কথায় একটু কথান্তরে যাওয়া, একটু আপনকথায় যাপনকথায় আসা, এসব সয়ে নিতে পাঠক বোধহয় ষোলো আনাই রাজি থাকবেন, এমনকী উৎসুক হয়ে থাকবেন। বিশেষত রুশতী সেনের কাছে। লেনদেনের বহর তো তাঁর সামান্য নয়। তদুপরি যাপনে যাঁর শিল্পের অভিঘাত একটি জরুরি বাস্তব। ■  ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top