বিশ্বরূপ মুখোপাধ্যায়‌: নিবেদিতা লোকমাতার ওপর তিনটি বই। মা সারদার আদরের খুকি, স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা, রবীন্দ্রনাথের সশ্রদ্ধ অভিধায় লোকমাতা, জগদীশচন্দ্র বসু–লেডি অবলা বসুর পরম–সুহৃদ এবং সেই সময়কার অনেক উজ্জ্বল মানুষের কাছের ও প্রিয় ব্যক্তি।
নিবেদিতার সার্ধশতবর্ষ জন্মজয়ন্তী উদ্‌যাপন উপলক্ষে এবং তার পর বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে আমরা পেয়েছি শঙ্করীপ্রসাদ বসুর অসামান্য কাজ— পাঁচটি খণ্ডে নিবেদিতা লোকমাতা। আমরা আলোচনা করব তিনটি উল্লেখযোগ্য বই নিয়ে যেগুলি সম্প্রতি প্রকাশিত।
‘ভগিনী নিবেদিতা:‌ মনীষীদের চোখে’ একটি উল্লেখযোগ্য সঙ্কলন। একই মলাটে আমরা পাচ্ছি ভগিনী নিবেদিতার ওপর লেখা— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র ও অবলা বসু, বিপিনচন্দ্র পাল, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, যদুনাথ সরকার, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু থেকে শুরু করে রমেশচন্দ্র মজুমদার, দিলীপকুমার রায়, রিচমন্ড নোব্‌ল এবং আরও অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তির। প্রতিটি লেখা পড়লেই ঋদ্ধ হতে হয়। প্রতিটি আলোচনা ও মূল্যায়ন আজও প্রাসঙ্গিক। এবং সকলেই যেটা বলতে চেয়েছেন, একজন বিদেশিনির এইরকম নিঃস্বার্থ সেবা ও ত্যাগ ভারতবর্ষ তথা বাংলা আগে কখনও সেভাবে পায়নি। আমাদের মতো সাধারণ পাঠকদের কাছে এই সঙ্কলনটি নিঃসন্দেহে একটি পরম প্রাপ্তি। বইটির মুদ্রণ পারিপাট্য, কাগজ এবং সর্বোপরি মুদ্রণপ্রমাদ সেভাবে চোখে না পড়া— অবশ্যই প্রশংসনীয়।
শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠের স্বামী আত্মবোধানন্দ মহারাজের লেখা ‘ভারত–‌সাধিকা নিবেদিতা’ বইটিও মূলত বিভিন্ন লেখা ও বক্তৃতার সংকলন। ছাত্রছাত্রী, তরুণ সমাজ বিশেষ করে ভগিনী নিবেদিতাকে যাঁরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে চান তাঁদের কাছে এই বইটি খুবই মূল্যবান। যেমন বইটির প্রথম লেখা ‘‌এক ঝলকে নিবেদিতা’‌ ভারি চমৎকার। জন্ম থেকে প্রয়াণ পর্যন্ত সুন্দর বিবরণ। যদিও পরিশেষে নিবেদিতার জীবনপঞ্জি রয়েছে। স্বামী আত্মবোধানন্দ তাঁর বইটিতে ‘‌ভারতসেবিকা নিবেদিতা’‌, ‘‌মার্গারেট থেকে নিবেদিতা’‌, ‘‌শ্রীশ্রীমাতৃসকাশে নিবেদিতা’‌, ‘‌নিবেদিতা ও রবীন্দ্রনাথ’‌, ‘‌স্বামী অভেদানন্দের দৃষ্টিতে নিবেদিতা’‌, ‘‌নিবেদিতার চোখে কালী’‌, ‘নিবেদিতার কাছে ঋণী কেন’‌ ইত্যাদি বিবিধ নিবন্ধে ভগিনী নিবেদিতার সামগ্রিক সত্তা ও ব্যক্তিত্ব ধরার চেষ্টা করেছেন এবং সফল হয়েছেন। স্বামী আত্মবোধানন্দও তাঁর বইটিতে রেখেছেন একটি অধ্যায়— ‘‌মনীষীদের চোখে নিবেদিতা’‌। পূর্বে আলোচিত বইটির মতো এই অধ্যায়টিও বইয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিবেদিতাকে জানতে হলে সমকালীন আলোচনা, প্রতি–‌আলোচনা জানাটা খুবই জরুরি। শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠের অন্যান্য বইয়ের মতো এই বইটিও মুদ্রণ পারিপাট্য ও বিন্যাসে উজ্জ্বল।  ‌ 
‌খুব ভাল ও ব্যতিক্রমী দেবাশিস পাঠকের ‘নিবেদিতার ডায়েরি:‌ বিতর্কিত টানাপোড়েন।’ দরকার ছিল— খুবই প্রয়োজন ছিল অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কাছে। নিবেদিতা লিখছেন, বলছেন, তাঁর ভাব প্রকাশ করছেন। শুরু সেই ১০ নভেম্বর, ১৮৯৫, রবিবার। সাউথ বেলগ্রেডিয়ার ৬৩ নং কেন্ট জর্জেস রোডে লেডি মার্গেসেনের বাড়িতে এক হিন্দু সন্ন্যাসীর বক্তৃতা। সন্ন্যাসী বক্তৃতা দিলেন এবং বললেন খ্রিস্টধর্মের মতো হিন্দুধর্মে প্রেমই শেষ কথা। অনুভব করালেন উত্তরণের কথা। এক সত্য থেকে আর এক সত্যের দিকে। মার্গারেট গিয়েছিলেন এবং ফিরেছিলেন এক ঘোরের মধ্যে দিয়ে। সেই শুরু— নিবেদিতা হয়ে ওঠার আখ্যান। স্বামী বিবেকানন্দ, তাঁর হাতে গড়া শ্রীরামকৃষ্ণ সংঘ, মা সারদা এবং সর্বোপরি ভারতবর্ষকে ভালবেসে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরার এক অনবদ্য আখ্যান। শুধু ত্যাগ আর নিঃস্বার্থ কর্মের মধ্য দিয়ে এক অমূল্য জীবন কাটিয়ে দেওয়া। ১৯ জুলাই, ১৯০২, শনিবার অমৃতবাজারে প্রকাশিত খবরটি এইরকম— ‘‌জনসাধারণকে এ কথা জানানোর জন্য আমাদের অনুরোধ করা হয়েছে যে, স্বামী বিবেকানন্দের শোকদিবস কেটে যাওয়ার পর বেলুড় মঠের সদস্যরা এবং ভগিনী নিবেদিতা একযোগে ঠিক করেছেন যে, এরপর থেকে ভগিনী নিবেদিতার কাজকর্ম পুরোপুরি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র, মঠ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই।’‌ ছাপার অক্ষরে দেখে লোকমাতার মনে হয়েছিল, ‘‌এর আগে মরলাম না কেন?‌’‌ খুব জানতে ইচ্ছে করে এই বিবৃতি দেওয়াতে সংঘজননী মা সারদার কি আদৌ কোনও সায় ছিল?‌ তারপর আরও ন’‌বছর। অনেক কাজ, অনেক সেবা। ১৩ অক্টোবর, ১৯১১, আচার্য জগদীশচন্দ্র ও লেডি অবলা বসুর দার্জিলিঙের বাসভবন। সেই সকালের সূর্যোদয়ের মাঝে নিবেদিতা যাত্রা করলেন রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দলোকে। মনে রাখতে হবে ‘‌খুকী’‌ নিবেদিতার আরেক জননী মা সারদা তখনও জীবিত। খুব ভাল কাজ করলেন দেবাশিস পাঠক। ■

জনপ্রিয়

Back To Top