প্রভাতকুমার দাস: আজকের বাংলা থিয়েটারের নিয়মিত দর্শকদের কাছে তিনি শ্রেষ্ঠ নট কিনা সে বিষয়ে কারও সংশয় থাকতে পারে, কিন্তু জনপ্রিয়তার নিরিখেই তিনি যে শীর্ষতম সে সম্পর্কে দ্বিমত নেই। মঞ্চাভিনয়ের ঐতিহ্যে যাঁরা কীর্তিমান, স্মরণীয়— যুগের প্রতিভূ, কারও সঙ্গে তুলনা না করে যদি বলি, শুধু নিষ্ঠা, সততা, অধ্যবসায় ও অক্লান্ত শ্রমশীলতার কারণেই দেবশঙ্কর হালদার অনন্য, দ্বিতীয়রহিত। তাহলে সে জন্য অতিশয় প্রশংসা ও ব্যাজস্তুতির দায় নিতে হবে না। সম্প্রতি তাঁর বন্ধু শোভন গুপ্তের সম্পাদনায় ‘‌নগরনট দেবশঙ্কর’‌ নামে ছশো পনের পৃষ্ঠার পরিসরে তাঁর জীবনকৃতীর পরিচয় যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা এককথায় অদৃষ্টপূর্ব।
যশস্বী ও কৃতবিদ্য অভিনেতা অভয় হালদার বাংলার পেশাদার যাত্রাজগতের এক স্মরণীয় নাম। তা সত্ত্বেও তাঁর তৃতীয় পুত্র দেবশঙ্কর শৈশবে নট হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি। বরং আবাল্য মোহনবাগানের ভক্ত— স্কুলজীবনে খেলার সময় বাইসাইকেল কিক নিতে গিয়ে কনুই না ভাঙলে ফুটবলই তাঁর ভবিষ্যৎ হত। বিজ্ঞানের স্নাতক, লিটল ম্যাগাজিন না রাজনীতি— এই প্রশ্নে দোলায়িত, অতি বামপন্থায় বিশ্বাস নিয়ে রেজাউদ্দিন ছদ্মনামে কাজ করে বুঝেছিলেন ও পথে সমাজবদল সম্ভব নয়। অথচ পারিবারিক সাহায্য হবে এমন কোনও পছন্দের চাকরি পাওয়াও দুর্লভ। অগত্যা উদ্‌ভ্রান্ত দশায় আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নান্দীকার আয়োজিত তরুণ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় যোগ দিয়ে নটের জীবনকেই স্থায়ী পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ক্রমে গত তেত্রিশ বছর সে দলের অভিনেতা হিসেবে বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার পথে, সর্বভারতীয় স্বীকৃতি হিসেবে ‘‌সঙ্গীত নাটক আকাদেমি’‌ পুরস্কার অর্জন।
১৯৮৬ থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর অভিনীত নাটক পঁয়ষট্টি।  আর যে সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন তা প্রায় ঊনসত্তর। বিস্ময়কর, এগুলি কোনও একটি দলের প্রযোজনা নয়— আমন্ত্রিত হয়ে বিভিন্ন দলে যুক্ত থাকার ফল। এই ‌বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত সারণির দৃষ্টান্তে জানা যাচ্ছে, এই মুহূর্তে বিশটি দলের হয়ে একত্রিশটি নাটকে অভিনয় করছেন। নিজের দলের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেও তিনি প্রমাণ দিয়েছেন— শ্রমনিষ্ঠা, প্রাণশক্তি ও দায়বোধের পরিচয় দিয়ে পেশাদারিত্বের কোন উচ্চতায় পৌঁছনো সম্ভব। এ জন্য যদিও তাঁকে অনেকের তীর্যক মন্তব্যেরও সম্মুখীন হতে হয়েছে। গুণগ্রাহীদের কেউ কেউ দুশ্চিন্তা করছেন, নিজের দল ছাড়াও এই যে বাইরের সংযুক্তি, এতে তাঁর প্রতিভার অপচয় হচ্ছে। অদম্য উৎসাহে, বেশি বেশি কাজ করতে গিয়ে কর্মশক্তিকে একটু বেশি করে পোড়াচ্ছেন কিনা। আবার শঙ্খ ঘোষের মতো বর্ষীয়ান দর্শক ‘‌স্বরে–‌শরীরে প্রত্যক্ষ শক্তির স্ফুরণ’‌— সকলের সঙ্গে সৌহার্দ্য নিয়ে মিলবার জোর আছে বলেই— সেটা হয়ে উঠেছে ‘‌আমাদের এই অসহায় সময়ের পক্ষে— ‘‌একটা অবলম্বন’‌, ‘‌একটা সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’‌
নাট্যসমাজের গুরুস্থানীয় প্রবীণ থেকে সমসাময়িক সহযাত্রী বন্ধুদের প্রায় অর্ধশতাধিক লেখায় তাঁর নাট্যজীবনের কৃতিত্বের কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমন তাঁর ব্যক্তিজীবন ধরা আছে, সাক্ষাৎকার, স্মৃতিকথায়। শুধু মঞ্চের নট মাত্র নন, চলচ্চিত্র, দূরদর্শন, শ্রুতিনাটক এমনকি দূরদর্শনের সঞ্চালনাতেও তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ আছে বহুতর রচনায়। আর এ–‌বই না পড়লে জানা যেত না— মৌলিক নাটক লেখায়, বা স্মারক বক্তৃতা প্রদানে, এমনকি রম্যগদ্য প্রণয়নে তিনি কত সাবলীল, দক্ষ। এটা এক অর্থে সম্মাননার স্মারক— চুয়ান্ন বছরে তাঁর জ্ঞানের ইতিবৃত্ত সংরক্ষণের এই প্রচেষ্টার জন্য সম্পাদক— অনুরাগীদের কৃতজ্ঞতাভাজন হবেন সন্দেহ নেই। 
বইয়ের শুরু হয়েছে— ভবিষ্যৎদ্রষ্টা পিতার দশটি মাত্র পঙ্‌ক্তির আশীর্বচন দিয়ে— পুত্রের প্রথম দশ বছরের কৃতিত্ব মূল্যায়ন করে যা নিজের দিনলিপিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘‌তোমার নাট্যপ্রতিভা দেশ, জাতি, সমাজকে সমৃদ্ধ করুক।’‌ যোগ্য পুত্র সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছেন। পরবর্তী দু দশকে গিরিশচন্দ্র, বিবেকানন্দ, দেবব্রত বিশ্বাস, শিশিরকুমার, অজিতেশ, অরবিন্দ ঘোষ থেকে বল্লভভাই চরিত্রের রূপায়ণে— বাংলা মঞ্চে জীবনীনাট্যকে কোনও একজন অভিনেতা এভাবে চরিতার্থ করেছেন বলে জানি না। এটা যদি নিতান্তই রূপসজ্জারই চমক মনে হয়— তবে তার বাইরেও এমন সব চরিত্র তিনি নির্মাণ করেছেন, যার দৃষ্টান্ত স্মরণকালের মধ্যে অনেক দিক থেকেই খুব কম অভিনেতার মধ্যে আমরা দেখতে পেয়েছি।
সবশেষে বলতেই হয়, প্রকাশনা–‌ব্যয় অনুযায়ী গ্রন্থমূল্য নির্ধারিত হলে— ক্রেতার সামর্থ্যের প্রতি সুবিচার হত। পাতায় পাতায় ছবি আছে, কিন্তু সে সবের জন্য পৃথক চিত্রসূচি অথবা ছবির সঙ্গেই তার পরিচয় না থাকা সবচেয়ে বড় অসম্পূর্ণতা। মুদ্রিত পঞ্জিগুলিও যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে তৈরি হয়নি। পাঠ্য অংশের কাগজ অপেক্ষাকৃত উন্নতমানের হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল, তার উপর সাদাকালো ছবির মুদ্রণ অত্যন্ত অযত্নের— এটা না হলে এই ‘‌মহাগ্রন্থ’‌–‌র আভিজাত্য সত্যি তৃপ্তিকর হত। তবু এই শ্রমসাধ্য সঙ্কলনটিকে সম্পাদক যেভাবে ‘‌একুশ শতকের বাংলা নাট্যাভিনয়ের একটি দলিল হিসেবে তৈরি করেছেন তা পাঠক, সমাদরের সঙ্গেই গ্রহণ করবেন সন্দেহ নেই।
 

নগরনট দেবশঙ্কর • সঙ্কলন ও সম্পাদনা:‌ শোভন গুপ্ত 
প্রতিভাস • ১০০০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top