বিশ্বরূপ মুখোপাধ্যায়: চৈতন্যদেবের জন্মস্থান কোথায়?‌ নবদ্বীপ, না মায়াপুর?‌ এই চর্চা বহু বছর ধরে চলে আসছে। কথামৃতে আছে, একবার শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর শিষ্য ও ভক্তদের নিয়ে নবদ্বীপ দর্শনে গিয়েছিলেন। তাঁরও ইচ্ছা ছিল চৈতন্যদেবের জন্মস্থান দর্শন করা। কিন্তু নবদ্বীপে তিনি তা খুঁজে পাননি। নৌকা করে মায়াপুরের দিকে যেতে মাঝ–‌ভাগীরথীতে তিনি দিব্যজ্ঞানে দেখতে পান, চৈতন্য মহাপ্রভু ও নিত্যানন্দ মহাপ্রভু রথে করে উপর থেকে নেমে আসছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ আর এগোতে চাননি;‌ ঘাটে নৌকা ভেড়াতে বলেন। কথামৃতে শুধু এটুকুই উল্লেখ আছে। তাহলে কি চৈতন্যদেবের জন্মস্থান বা ভিটে ভাগীরথীতে হারিয়ে গিয়েছে?‌ নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শান্তিরঞ্জন দেব, বইয়ের কথামুখে জানাচ্ছেন, ১৭৬০–‌৬২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বর্তমান শহর নবদ্বীপের উত্তর–‌পূর্ব কোণে গঙ্গা–‌জলঙ্গী মিলিত হয়ে নবদ্বীপের পূর্বদিকের জলঙ্গীর পুরনো খাত দিয়ে গঙ্গা প্রবাহিত হতে থাকে। এই সময় নবদ্বীপের পশ্চিমে এবং পূর্বে গঙ্গার অবস্থান দেখা যায়। এরপর থেকেই নবদ্বীপের পশ্চিমে প্রবাহিত গঙ্গার ধারা ক্ষীণ ও ম্রিয়মাণ হতে থাকে। ১৭৬০–‌এও নবদ্বীপের বৈদিকপল্লী গঙ্গাকবলিত হয়নি। বৈদিকপল্লী অর্থাৎ চৈতন্যদেবের ভদ্রাসন গঙ্গাকবলিত হয় ১৭৭৭–‌৮২–‌র মধ্যে। কারণ, পুরানো দলিলপত্র থেকে জানা যায়, ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে বৈদিকপল্লী গঙ্গাকবলিত হওয়ায়, নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র বৈদিক ব্রাহ্মণদের নতুন করে যে অঞ্চলে বসতি করে দিয়েছিলেন, সেই অঞ্চলটি আজও নবদ্বীপে বৈদিকপাড়া নামে খ্যাত।
আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে বহু বছর ধরে কাজ করছেন যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী মহাশয়। তাঁর সেই ইতিহাস–‌চর্চার মূল্যবান সংযোজন ‘‌শ্রীচৈতন্যদেব ও সমকালীন নবদ্বীপ’‌। বৈষ্ণব ভক্তদের একটা বড় অংশ মনে করেন, মায়াপুরে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রতিষ্ঠিত যোগপীঠ মন্দিরই শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মস্থান। কিন্তু যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী তাঁর এই বইতে নানান  গবেষণামূলক তথ্য পেশ করে জানিয়েছেন, ‘‌চৈতন্যদেব নবদ্বীপেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে শহরের অবস্থানের তারতম্য ঘটলেও দ্বিতীয় নবদ্বীপ সৃষ্টি হতে পারে না।’‌ শ্রী চৌধুরি তাঁর এই বইতে আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। সেটি হল, চৈতন্যদেবের সমসাময়িক নবদ্বীপের খ্যাতনামা পণ্ডিতদের বাসস্থান ও বংশাবলী বিষয়ক আলোচনা। গবেষক ও কৌতূহলী পাঠকের কাছে যা একান্ত জরুরি। এই আলোচনায় আছেন বাসুদেব সার্বভৌম, রঘুনাথ শিরোমণি, রামভদ্র সার্বভৌম, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, কৃষ্ণদাস সার্বভৌম, রঘুনন্দন ভট্টাচার্য, জগদীশ তর্কালঙ্কার প্রমুখ। শ্রীচৈতন্যদেব ও নবদ্বীপ চর্চায় বইটি যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ■

জনপ্রিয়

Back To Top