আইভি চট্টোপাধ্যায়: সংশয়ের আঘাত বড় হয়ে এলে প্রাপ্তির বোধ হারিয়ে যায় কখনো কখনও। জীবনের প্রান্ত–‌মুহূর্তগুলোয় এমন ঘটে প্রায়ই। রমাপদ চৌধুরীর ‘তিনটি উপন্যাস’ পড়তে গিয়ে এ কথা অনুভব করলাম। ‘দ্বিতীয়া’, ‘চড়াই’ আর ‘স্বজন’— তিনটি উপন্যাস।
সমাজে মধ্যবিত্তের মানসিকতার প্রভাব, দোলাচল, অনিশ্চয়তা, হতাশা, প্রতারণা রমাপদ চৌধুরীর লেখায় এসেছে বিভিন্নভাবে। তাঁর সব গল্প–‌উপন্যাসে একটি যুগযন্ত্রণা প্রকাশ পায়। সমাজের কপটতায় আঘাত করে এমন বিষয়বস্তু তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে। আলোচ্য ‘তিনটি উপন্যাস’ও একই কথা বলে। তবে বিষয়বস্তুতে যত দোলাচলই থাকুক, যাত্রাপথের শেষে ভালোবাসায় আত্মস্থ হয়ে ওঠেন লেখক। পাঠকও।
তিনটি উপন্যাসে স্বাভাবিকভাবেই গল্পের বিষয়বস্তু আলাদা। প্রথম উপন্যাসের নাম ‘দ্বিতীয়া’। স্বামীর মৃত্যুশোকের মাঝেই মনের ছবিঘরে স্মৃতি সাজিয়ে নিচ্ছে স্ত্রী। পাঠকের অবচেতনে রবি ঠাকুরের গান...‌ ‘নয়ন সমুখে তুমি নাই... নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই’— পুরোনো সেই আসা–‌যাওয়ার সকালসন্ধ্যা নিয়ে গড়ে উঠেছে উপন্যাস। ‘‌মানুষের মনের মধ্যে পৃথক পৃথক কয়েকটা স্তর আছে। একটা স্তরে যখন প্রচণ্ড দুঃখ বা শোকে মানুষটাকে নির্জীব করে রাখে, অন্য স্তরে তখন বুদ্ধি বা অভ্যাস মানুষটাকে চালিয়ে নিয়ে যায়।‌’‌ স্বামীর মৃত্যুর পর যে সুদেষ্ণা মনে করছে, ‘‌পবিত্রতা একটা গর্ব, শোকও সমান গর্ব’‌, সেই সুদেষ্ণাই বৈধব্যের ‘‌বিষণ্ণতার মুখোশ’‌ খুলে ফেলার খেলা খেলতে চাইছে। কিন্তু খেলাটা যেন ‘নিষ্পাপ’ থাকে। জয়ন্তর বিধবা স্ত্রী আর ঝুমুরের মা, এই পবিত্র পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যেই জীবনে দ্বিতীয় পুরুষকে একটু ছুঁয়ে থাকার দোটানায়। এই ছুঁয়ে যাওয়া কিন্তু কোনওভাবেই একেবারে মিলে যাওয়া নয়। আপাতবৃত্ত যে সত্যিই বৃত্ত হয়ে ওঠে না।
দ্বিতীয় উপন্যাস ‘চড়াই’। জগত্‍ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার মুহূর্তে, সামাজিক পরিকল্পিত জীবনধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বা একক হলেই অসম্পূর্ণ এমন মনভার করা সময়ে, প্রেম থেকে শূন্যতার আত্মবিহ্বল মুহূর্ত। এই ধূসর অবকাশে সমস্তকে এক বিন্দুতে ধারণ করার সামর্থ্যে নিরূপা বেঁচে থাকার পরিধিটাকে একইসঙ্গে ছড়িয়ে দিয়ে একান্ত আপন করে নেয়, ‘সেই জায়গাটাকে দেখব একবার, যেখানে মরতে চেয়েছিল একটা মেয়েকে আপনি বাঁচিয়েছিলেন। একটু থেমে সমীরণের চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, কিংবা বাঁচতে চায় একটি মেয়েকে।’‌ পলকে পূর্ণ হয়ে ওঠে একটি জীবন।
‘স্বজন’ উপন্যাসে তিনি একটি মহাযুদ্ধের দৃশ্যকল্প তুলে ধরেছেন লেখক। যুদ্ধের বিশাল আয়োজন, পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা, ক্রিয়া–‌প্রতিক্রিয়া তুলে ধরার পাশাপাশি সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তার আঁচ এসে পড়ার অপরূপ নকশিকাঁথা। যুদ্ধবন্দী একজন ইতালিয়ান সৈনিককে মুক্তি দেয় একটি সাধারণ, অথচ অসাধারণ পরিবারের একটি মেয়ে। অনিশ্চয়ের উদ্বেগ থেকে মুক্তি। নিবিড় একটা পুলক, একজন সার্থক ঔপন্যাসিকের কাজ। ■
তিনটি উপন্যাস • রমাপদ চৌধুরী • দে’জ পাবলিশিং • ৩০০ টাকা‌

জনপ্রিয়

Back To Top