‌অপ্রমেয় দত্তগুপ্ত:‌ সদ্য প্রয়াত হয়েছেন লোকসভার অধ্যক্ষ তথা সিপিএমের বহিষ্কৃত সাংসদ সোমনাথ চ্যাটার্জি। মৃত্যুর পরও যাঁকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে গড়িমসি করেছিল সিপিএম পলিটব্যুরো। সময় নিয়েছিল সাড়ে পাঁচ ঘন্টা। তারপরও বিবৃতিতে লিখতে পারেনি প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ ছিলেন তাঁদের দলের সদস্য। কারণ তখনও সুকৌশলে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল শক্তিশালী কারাত লাইন। এই ঘটনায় মুখ পোড়ার পর এবার দলের অন্দরেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে দল থেকে বহিষ্কৃত সদস্যদের সঙ্গে দলে থাকা সদস্যরা যোগাযোগ রাখবে, নাকি রাখবে না। সেখানেও ধরি মাছ না ছুঁই পানি পথই বেছে নিলেন বঙ্গব্রিগেডের পক্ককেশধারীরা। 
সোমনাথ চ্যাটার্জি প্রয়াত হওয়ার পর অনেক সিপিএম নেতারাই প্রকাশ্যে বলেছিলেন তাঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল সোমনাথবাবুর। আর তাতেই নাকি অনেকে দলের রোষের মুখে পড়েছেন। যদিও প্রকাশ্যে এই ব্যাপারে কেউ মুখ খুলতে নারাজ। কারণ যদি মৃত্যুর পরে লাল পতাকা না দেয় দল। দলের এমন পরিস্থিতিতে ফেসবুকে একটি লেখা পোস্ট করেছেন সিপিএমের প্রবীণ নেতা তথা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শ্যামল চক্রবর্তী। তিনি লিখেছেন, ‘‌একটা আলোচনা চলছে। বহিষ্কৃত কমরেডদের সঙ্গে পার্টি সদস্যরা যোগাযোগ রাখবে কিনা? এটা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট বহিষ্কৃত কমরেড কি ভূমিকা পালন করছেন তার উপর। তিনি যদি পার্টির স্বপক্ষে থাকেন তবে অবশ্যই যোগাযোগ রাখব। ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা উচিত। যদি পার্টির পক্ষে বিপক্ষে কোনও মতামত নাও দেন তা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। যারা বিরুদ্ধে বলবেন বা অন্য পার্টিতে যোগ দেবেন তারা অবশ্যই ঘৃণাভরে পরিত্যাজ্য। কমরেড সোমনাথ চ্যাটার্জীর সঙ্গে আমার অনিয়মিত হলেও যোগাযোগ ছিল। কলকাতায় ও শান্তিনিকেতনে। দু বাড়ীতেই।’‌ শ্যামলবাবুর এই পোস্ট কেন তা বলতে না চাইলেও, দলের বাইরে থাকা সোমনাথবাবুর সঙ্গে যোগাযোগের কথা অকপটে স্বীকার করার ফলেই তাঁকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে বলে সূত্রের খবর। আর তার জেরেই নাকি এই ফেসবুক পোস্ট। 
প্রয়াত হওয়ার পরও সোমনাথ চ্যাটার্জিকে যে তিনি ভুলতে পারবেন না সে কথাও তুলে ধরেছেন তাঁর ফেসবুক পোস্টে। তিনি লিখেছেন, ‘‌এরপর ১৯৭১ সাল থেকে তো সোমনাথ দার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। অনেকেই তার পার্লামেন্টারি ভূমিকা নিয়ে কথা বলছেন। আমি সে সম্পর্কে কোনও অতিরিক্ত কথা বলব না। কেমন করে ভুলি আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের সময় তার সাহসী অগ্রগণ্য ভূমিকা। সেই ১৯৭১ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত। এমপি হিসাবে যেখানেই সন্ত্রাস সেখানেই ছুটে গিয়েছেন। গুন্ডাবাহিনী বোম ছুঁড়ছে। কোনও তোয়াক্কাই করছেন না। ১৯৭৪ সালে সন্ত্রাসকে উপেক্ষা করে চটকল শ্রমিকরা ৩৩ দিন ধর্মঘট করেছিলেন। তাদের সমর্থনে সোমনাথ দা, নীরেন দা (নীরেন ঘোষ , এমপি , এবং চটকল ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক) পুলিসি সন্ত্রাসকে দু’‌পায়ে মাড়িয়ে দৃপ্ত মিছিল হাজার চটকল মজদুরদের বিপুলভাবে উজ্জীবিত করে। ৪২টি ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। অত আক্রমনের বিরুদ্ধে সোমনাথদাকে সামনে পেলে শ্রমিক কর্মচারীরা নিজেদের নিরাপদ মনে করত। কত মামলায় যে তিনি আক্রান্ত শ্রমিক দের অনিবার্য ছাঁটাই রুখে দিয়েছেন কে হিসাব রাখে তার। পুলিস–সরকার বদ্ধপরিকর, কোনো কমরেডকে জেলে রাখবেই, তাকে প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্ট থেকে ছাড়িয়ে এনেছেন। ফেরার পয়সা নেই তাকে নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে কলকাতায় ফেরত পাঠিয়েছেন।’‌ এমনই অনেক কথা লিখেছেন শ্যামলবাবু। এমনকী পুরনো স্মৃতি হাতড়ে বলতে চেয়েছেন কোনও অন্যায় তিনি করেননি। তাহলে আজও যদি বেঁচে থাকতেন সোমনাথ চ্যাটার্জি যোগাযোগ রাখতেন কি শ্যামলবাবু?‌ 
সরাসরি এই প্রশ্নের উত্তর তিনি দেননি। তবে ফেসবুক পোস্টে খানিকটা উত্তরের ঢঙেই তিনি লিখেছেন, ‘‌পার্টি থেকে বহিষ্কারের কয়েকদিন পর আমার সঙ্গে দেখা হল কলকাতা ফেরার বিমানে। বৌদি ছিলেন সঙ্গে। আমি এগিয়ে গিয়ে সোমনাথদার হাত ধরলাম, আমি আপনার বাড়িতে যেতে চাই। সোমনাথ দা ধরা গলায় বললেন তোমাকে পার্টি পারমিশন দেবে তো? আমার গলাও স্বাভাবিক ছিল না। বললাম পার্টি আপনাকে তো শত্রু হিসাবে দেখছে না, আপনার সঙ্গে যোগাযোগ না রাখার তো কোনও নির্দেশ নেই। ততক্ষণে সোমনাথদা ফোঁপাচ্ছেন, চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে গালে। এরপর কতবার গিয়েছি রাজা বসন্ত রায়ের বাড়িতে। রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়িয়ে পার্টি সংগঠনের দুর্বলতা। উনি অনেক খবর রাখতেন। বিশেষ করে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের। বলতেন এগুলো তোমরা দেখ, সামলাও।‌’‌ তারপরই তিনি লেখেন, ‘‌সোমনাথ দা আমাদের কাছে কমরেড সোমনাথদাই ছিলেন। কমরেড সোমনাথ চ্যাটার্জী। এটা একেবারেই ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ।’‌ এমন ছোট ছোট ঘটনার কথা লিখে ফেসবুকে পোস্ট করে যেন কারাত লাইনকেই পাল্টা বার্তা দিতে চাইলেন তিনি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। 

জনপ্রিয়

Back To Top