ঋদ্ধি সেন
বছরের শুরুটা যেমন কাটে, গোটা বছরটা তেমনই কাটে। আমি তাই নিশ্চিন্তে বছরের শুরুর দিনটতে দেখতে গিয়েছিলাম অতনু ঘোষের ছবি ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌। হতাশ তো হইনি, বরং এটা বুঝতে পেরেছি, যে বছরটা আমার খুবই ভাল কাটতে চলেছে। কারণ, প্রথম দিনে এমন মন ভাল করা ছবি দেখার অর্থ, সারা বছর এমনই কাটবে। ভাল ছবি দেখবো, ভাল ছবিতে কাজ করবো। 
বাঙালি দর্শকের একটা বিষয় আছে। তাঁরা ছবিতে গল্প দেখতে ভালোবাসেন। সোজা গল্প, সোজা বলে দিলেই যেন তাঁরা খুশি হন। একটুও যাতে ভাবতে না হয়। কিন্তু দর্শককে ভাবিয়ে তোলা তো ছবি নির্মাতাদেরই দায়িত্ব। তাঁদের তো এমন ছবি বানাতে হবে, যাতে দর্শক ছবিটি নিয়ে ভাবতে পারেন। ছবি দর্শকের মনোরঞ্জনের কাজ করবে, কিন্তু ভাবাবেও। ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌ ঠিক এই কাজটাই করেছে। হল ভর্তি দর্শককে ভাবিয়েছে। শুধু খালি মাথায় ছবি দেখায়নি। আমরা সকলেই ভেবেছি। এটাই বোধহয় স্বার্থক শিল্প হয়ে ওঠা। 
আর একটা কথা বলা খুব জরুরি। আচ্ছা, একটা ছবিতে কেন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করা হয়?‌ মানে ছবির অভিনয়, তার আবেগ ইত্যাদিকে আরও ফুটিয়ে তুলতেই কাজে লাগে আবহের ব্যবহার। কিন্তু কিছু ছবি এই চেনা ছকের বাইরে থাকে। যে ছবিতে আসলে অভিনয় হয়ে ওঠে আবহ। ধারে ভারে ছবির শিল্পীরা এতটাই উচ্চমানের কাজ আমাদের উপহার দেন, যে ছবির আধার যেন গল্প, সম্পাদনাকে ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে অভিনয়।

এই ছবি দেখলে সেই কথাটা স্পষ্ট বোঝা যায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, গার্গী রায়চৌধুরি, প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি থেকে শুরু করে সকলেই অভিনয়কে এক অন্য মার্গে নিয়ে যান এই ছবিতে। কথা প্রসঙ্গে এখানে বলতে ইচ্ছা করছে, যে অনেকেই ভাবেন প্রসেনজিৎ বা সৌমিত্র চ্যাটার্জির আলাদা করে অভিনয় নিয়ে নতুন কিছু প্রমাণ করার নেই। আমার মনে হয়, এটা ঠিক কথা নয়। একজন অভিনেতা, যতদিন যে কোনও মাধ্যমে অভিনয় করছেন, ততদিন তাঁর নতুন কিছু প্রমাণ করার ইচ্ছাই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে। এই ছবিটি দেখলে বোঝা যায়, কীভাবে নিজেদের নতুন করে খুঁজে পেয়েছেন এই দুই অভিনেতাই। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অতিমানবিক অভিনয় সত্যি আমাকে অবাক করেছে।
একটা কথা চালু ছিল, বাংলা আর্ট ফিল্ম আর বাংলা বাণিজ্যিক ছবি। ক্রমে এই দূরত্ব এখন কমে এসেছে। মেটেনি সবটা, তবে অনেকটাই কমেছে ব্যবধান। হিন্দিতে রাজকুমার রাওয়ের মতো অভিনেতারা যে ছবিগুলো করছেন, সেগুলি যেমন ভাবে বাণিজ্যিক ভাবে সফল, তেমন ভাবেই শৈল্পিক গুনে উন্নত। বাংলাতেও তেমন কাজ হচ্ছে। আর সেটাই আমাদের ভরসা। যেখানে উঁচুদরের শিল্পীকে না খেয়ে মরার ভয়ে থাকতে হচ্ছে না। মানুষ, সাধারণ দর্শক পাশে থাকছেন। না হলে, সপ্তাহ শেষে টাইগার জিন্দা হ্যায় বা অ্যামাজন অভিযানের ভিড়ে হারিয়ে যেত ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌। যায়নি হারিয়ে। হাউজফুল হয়েছে শো। এটাই জয়।  

জনপ্রিয়
আজকাল ব্লগ

Back To Top