দিল্লিতে শতাধিক মহিলা সাংবাদিককে ডেকে চা–‌চক্র রাহুলের। পরদিন সব কাগজে প্রচারিত হল, তিনি বলেছেন, মমতা বা মায়াবতীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে কোনও আপত্তি নেই। কংগ্রেস মুখপাত্র বললেন, ঠিক কী বলেছেন, জানি না। রাহুল গান্ধী এটাই চেয়েছিলেন। প্রচারিত হোক মমতা বা মায়াবতীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু, উদ্ধৃতি নেই। আড্ডা মারতে মারতে বলা। ভাসিয়ে দেওয়া। ছড়িয়ে দেওয়া। আন্তরিক হলে, প্রকাশ্যেই বলতেন।
কেন বললেন?‌ প্রথমত, একটা ভুল করে বসে আছেন। বিরোধী শিবিরের কেউ যা বলেননি, তিনি বলেছেন দু’‌‌মাস আগের সাংবাদিক সম্মেলনে। ‘‌যদি কংগ্রেস সবচেয়ে বেশি আসন পায়, আমি প্রধানমন্ত্রী হতে প্রস্তুত।’‌ কংগ্রেস সভাপতি, দলের এক নম্বর নেতা, বারো বছর ধরে তাঁকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরছে কংগ্রেস। ২০০ আসন পেলে, ছেড়ে দেবেন?‌ লোকসভায় সবচেয়ে বড় দল, কিন্তু আসন ১৫০, প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্ভব?‌ প্রায় সব বিরোধী দলের সমর্থন লাগবে, যা পাবেন না। মোদি বলতে শুরু করেছেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য এত তাড়াহুড়ো কীসের?‌ নির্বাচনী প্রচারে এই অস্বস্তি থেকে রক্ষা পাওয়াই লক্ষ্য। বিরোধী শিবিরে অসন্তোষও টের পেয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, ভাবমূর্তি নির্মাণ। ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে না বসে নিজেকে অনেক ওপরে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন সোনিয়া গান্ধী। সুষমা স্বরাজ বলেছিলেন, বিদেশিনী প্রধানমন্ত্রী হলে মাথা ন্যাড়া করে ফেলবেন। ওই ‘‌ন্যাড়া’‌ হুমকিতে নয়, রিমোট কন্ট্রোল হাতে রেখে ত্যাগী ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করলেন সোনিয়া। আগে ভুল করে ফেলে শোধরাতে চাইলেন রাহুল। তিনিও ত্যাগের ভাবনায় মহীয়ান। যেন মানুষ ভাবেন, বাঃ, কোনও লোভ নেই।
ওই সাংবাদিক সম্মেলনেই প্রশ্নের জবাবে বলতে পারতেন, ‘‌প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে আমরা ভাবছি না। লক্ষ্য একটাই, সাম্প্রদায়িক ও বিপজ্জনক বিজেপি–‌কে ক্ষমতাচ্যুত করা।’‌ বলেননি, কারণ, লক্ষ্যে স্থির, প্রধানমন্ত্রী হতে হবে। জওহরলাল নেহরু হয়েছেন, ইন্দিরা গান্ধী হয়েছেন, রাজীব গান্ধী হয়েছেন, সোনিয়া গান্ধী হাতে পেয়েও নেননি, তিনি কেন হবেন না!‌‌
এখন বুঝছেন, অত সহজ নয়। অধিকাংশ রাজ্যে আঞ্চলিক দল প্রবল শক্তিশালী। বলছেন, বিজেপি–‌বিরোধী জোট চাই। কিন্তু ভেতরে–‌ভেতরে কাজ করছে চিরকালের কংগ্রেসি অভ্যেস, ‘‌নেহরু–‌গান্ধী পরিবারের সদস্য আমি, প্রধানমন্ত্রী হব!‌’‌ লোভটা ঢাকতে বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া, মমতা বা মায়াবতীকেও মানতে প্রস্তুত। প্রকাশ্যে বলছেন না। পাছে কংগ্রেস কর্মীদের উদ্দীপনা কমে যায়।
লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাবে রাহুলকে আগের চেয়ে উজ্জ্বল লেগেছে। আসল কথা হল, ‘‌আগের চেয়ে।’‌ হোঁচট খেতে খেতে, মিহি গলায় সেই কলাবতী ভাষণ নয়। মঞ্চটা তৈরি করে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। চার বছরের অপশাসন মানুষকে বিকল্পের দিকে তাকাতে বলছে। রাহুল একটা সুযোগ পেলেন। সুযোগের কতটা সদ্ব্যবহার করলেন, পরে বুঝছি। প্রথম কথা, প্রধানমন্ত্রী মোদি ভাষণেও ডাহা ফেল। দেড় ঘণ্টার ভাষণে সেই তেজ নেই, ছাপান্ন ইঞ্চি ছাতির প্রতাপ নেই, গড়গড় করে সরকারি কাজের তালিকা বলে যাওয়া। এবং নেহরু–‌গান্ধী পরিবারকে আক্রমণ। শুধু ভাষণে নয়, আচরণেও ফেল। রাহুল যখন নিজের ভাষণের পরে তাঁর দিকে গিয়ে আলিঙ্গন করলেন, মোদি মহোদয়ের মুখটা ছিল দেখার মতো। ছবি দেখেছেন সবাই। হতভম্ব। যেন বলতে চাইছেন, ‘‌এ কী উপদ্রব‌!‌’‌ বক্তৃতায় অযথা এই প্রসঙ্গ টেনে আনলেন। এবং হাস্যকর ভাবে। বললেন, ‘‌একজন আমাকে বলল, ওঠো, ওঠো! চেয়ারে বসার জন্য এত তাড়াহুড়ো কীসের?‌ প্রধানমন্ত্রীর আসনে আমাকে বসিয়েছেন দেশবাসী, কারও দয়ায় নেই।’‌ 
রাহুল প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে বলেন, একবার উঠবেন প্লিজ?‌ মোদি বসেই থাকলেন। প্রায় ডাইভ দিয়ে আলিঙ্গন করে ছাড়লেন রাহুল। পরিকল্পিত চিত্রনাট্য, সহ–‌অভিনেতা সহযোগিতা না করলেও নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করতে হবে। চিত্রনাট্য অনুযায়ী আলিঙ্গন–‌পর্ব শেষ করার পর নিজের আসনে ফিরেই জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন। কেমন দিলাম!‌ এই চোখ টেপা নিয়ে কিছু সমালোচনা হচ্ছে। এত ভাল নাটকটাকে নষ্ট করে দিলেন!‌ চূড়ান্ত ফাজলামি। 
এবার বহুল প্রচারিত আলিঙ্গন প্রসঙ্গে আসব। অনেকেই ‘‌আহা আহা’‌ করছেন। দেখুন দেখুন, ঘৃণার জবাবে ভালবাসা। আলিঙ্গন। রাজনৈতিক সৌজন্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় হইচই। সোজাসুজি বলি, এই আলিঙ্গন প্রমাণ করল, সোনিয়া–‌তনয় এখনও পরিণত হননি। সংসদীয় সৌজন্য এ কথা বলে না যে, এক বিরোধী বক্তৃতা শেষ করে প্রধানমন্ত্রীকে জাপটে ধরবেন। তার চেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক যুদ্ধের পরিবেশটাকেই হালকা করে দিলেন রাহুল। নোটবন্দি, লক্ষ মানুষের কর্মহানি, বিপুল বেকার সমস্যা, হাজার হাজার কৃষকের আত্মহত্যা, সংখ্যালঘু নিগ্রহ, দলিত দমন, ফুঁসছে দেশ। দেশের কোনও প্রথম সারির নেতা বক্তা নন, ফাঁকা মাঠ পেয়েছিলেন। শুধু সুযোগ নষ্ট নয়, অন্যায় করলেন। মানুষের যন্ত্রণা ও ক্ষোভকে গভীরভাবে তুলে ধরার জন্য অনাস্থা প্রস্তাব। সেই যন্ত্রণাবিদ্ধ, ক্ষুব্ধ মানুষদের অপমান করলেন রাহুল গান্ধী।

জনপ্রিয়

Back To Top