সৌগত চক্রবর্তী: ‌• আপনি তো সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, মীরা নায়ার, সঞ্জয় লীলা বনসালি সহ অসংখ্য পরিচালকের ছবিতে বহু স্মরণযোগ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই চরিত্রগুলোর মধ্যে আপনি প্রোফেসর শঙ্কুকে কোন জায়গায় রাখবেন?‌
•• প্রফেসর শঙ্কু খুবই শক্তিশালী একটা চরিত্র। বাংলা সাহিত্য থেকে উঠে আসা এমন একটা চরিত্র খুবই বিরল। এই চরিত্র সিনেমায় আনা যাবে কিনা, সে সম্পর্কে সত্যজিৎ রায়ও মনে হয় ভাবেননি। তখনকার দিনে তা হয়ত সম্ভবও ছিল না। কারণ তার যে আয়োজন, তার যে অর্থব্যয়—সেটাও করা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় ছিল। কাজেই সেই দিক থেকে এটা খুবই মনে রাখার মত একটা চরিত্র।
• কখনও কি আপনি ভাবতে পেরেছিলেন, এই প্রোফেসর শঙ্কু সিনেমায় আসবেন এবং আপনিই প্রোফেসর শঙ্কুর চরিত্রে অভিনয় করবেন?‌
•• না, এইটা আমার চিন্তার মধ্যে কোনওদিন আসেও নি। এই যে আপনাকে বললাম, শঙ্কুকে নিয়ে এই কলকাতায় বসে কোনও ছবি করা যাবে কি না, সেটা নিয়েই একটা প্রচণ্ড জিজ্ঞাসার চিহ্ন ছিল। একজন অভিনেতা হিসেবে তো এরকম চরিত্রে অভিনয় করতে ভালই লাগে। তবে সেটা নিয়ে আমি যে খুব একটা ভেবেছি তা নয়।
• এখন এই চরিত্রে অভিনয় করে আপনার কেমন লাগছে?‌
•• আমায় তো এটা খুব চ্যালাঞ্জের সঙ্গে নিতে হচ্ছে। কারণ শঙ্কুকে আমরা সত্যজিৎ রায়ের গল্পে যা দেখেছি, তাকে আমায় সিনেমায় হবহু মেলাতে হবে কি না, বা তার থেকে কোনও সুবিধা নেওয়া যায় কি না—এই চিন্তা পরিচালকের এসেছে, আমারও এসেছে। সেই প্রশ্নগুলোর এক ধরনের উত্তর খুঁজে বের করে তার থেকে শঙ্কুকে নির্মান করাটা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল।
• আপনি যখন শঙ্কুর গল্প পড়েছিলেন তখন তাঁর একটা ছবি নিশ্চয়ই সামনে ভেসে উঠেছিল। যেমন তার হাব-‌ভাব, তার কথা বলার ধরন ইত্যাদি। আপনি যখন সিনেমায় এই চরিত্রে অভিনয় করলেন, তখন কি সেই আগে মনের মধ্যে তৈরি হয়ে যাওয়া শঙ্কুর ছবিটার সঙ্গে মিলেছে?‌
•• প্রথমেই বলে রাখা ভাল, কোনও একটা চরিত্র করার আগে সেই চরিত্র নিয়ে ভাবনা-‌চিন্তা, বিশ্লেষণ, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি করার পক্ষপাতী আমি নই। দ্বিতীয়ত, আমার প্রথম দায়বদ্ধতা পরিচালকের যে ভিশন, সেটাকে মর্যাদা দেওয়া। এবং চিত্রনাট্য সেই চরিত্র সম্পর্কে কী বলছে তাকে ফলো করা। এমনকি যখন কোনও সাহিত্য নির্ভর ছবি করতে হয়, যদি দেখি তা আমার পড়া নেই, তখন সেই গল্প বা উপন্যাসটা আমি পড়ি না। তবে শঙ্কুর ক্ষেত্রে, আমি সাধারণত যতটা চিন্তা-‌ভাবনা করি সেই চরিত্র নিয়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি করতে হয়েছে। কারণ, শঙ্কুর গল্পগুলো ডায়েরির ফর্মে লেখা। আমরা তার থেকে নানারকম ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারছি কিন্তু তার চরিত্র সম্পর্কে খুব একটা জানতে পারছি না। একেবারে শেষের দিকে শঙ্কুর যে শেষ গল্প, তাতে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শঙ্কুর বাবার কথাও এসেছে, সেখানে পরিবারের কথাও এসেছে, সেখানে বাবার মূল্যবোধ এসেছে এবং তার থেকেই শঙ্কু কী ধরনের মানুষ, মানসিক দিক থেকে কী ধরনের, সেটার আমরা একটা ধারণা করতে পারি। সত্যজিৎ রায় যে ছবিটা এঁকে গিয়েছিলেন তা থেকে শারীরিক দিক থেকে শঙ্কু কীরকম মানুষ, তারও একটা আভাস পাই। কিন্তু পরে আবার যখন শঙ্কুকে কমিকসে নিয়ে আসা হল, তখন সেই অবয়বও কিছুটা পাল্টে গেল। এইগুলো মাথায় রাখতে হয়েছে। একদিকে শঙ্কু খুবই মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত, বাঙালি। সেটা যেমন সত্যি, অন্যদিক থেকে এটাও তেমন সত্যি, শঙ্কু একজন আন্তর্জাতিক মানু্য। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকায় তার লেখা বেরোয়, বিভিন্ন দেশে কনফারেন্সে যান, তাঁর দুই অন্তরঙ্গ বন্ধু—একজন ব্রিটিশ, একজন জার্মান। তাই এই চরিত্র গঠনের দিক থেকে আমি শঙ্কুর সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের একটা মিল খুঁজে পাই। এই সমস্তগুলোকে মিলিয়ে আমি চরিত্রটা নির্মান করেছি।
• এই সিনেমার শুটিং হয়েছে সাও পাওলো ও আমাজনের জঙ্গলে। সেই অভিজ্ঞতা কেমন?‌
••  সেই অভিজ্ঞতার কথা আমি বারবারই বলেছি। আমরা যখন ঘুরতে বেরোই, বিদেশে যাই, তখন যে জায়গাগুলোতে যাবার সুযোগ হয় তার মধ্যে সাধারণত ব্রাজিল বা আমাজন তো পড়ে না। কাজেই এটা একটা দুষ্প্রাপ্য অভিজ্ঞতা। এমনিতে আন্তর্জাতিক ছবি করতে আমার ভাল লাগে। কারণ বিভিন্ন দেশে কীভাবে কাজ হচ্ছে তার একটা ধারণা পাওয়া যায়। সেই অভিজ্ঞতাও পাওয়া গেছে।
• আপনি তো সত্যাজিৎ রায়ের তিনটি ছবিতে অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি তাঁর ছেলে সন্দীপ রায়ের ছবিতেও কাজ করেছেন। এই দুই পরিচালকের কাজের বৌশিষ্ট্যগুলো কী কী?
•• এই প্রসঙ্গে একটাই কথা বলা যায় যেহেতু সত্যজিৎ রায় ও বাবু (‌সন্দীপ রায়)‌ একই ঘরানার মানুষ, তাই কাজের ক্ষেত্রে দুজনের বেশ মিল আছে। সত্যজিৎ রায় যে কাজগুলোয় পারদর্শী ছিলেন সন্দীপও সেই কাজগুলোয় পারদর্শী। যেমন‌ সঙ্গীত রচনা, পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে চিত্রনাট্য তৈরি করা, সম্পাদনা ইত্যাদি। সত্যজিৎ রায়ও সব দিকটাই দেখতেন,  বাবুও সব দিকটাই দেখে। এটাই দুজনের সাদৃশ্য। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে মানুষে মানুষে তো পার্থক্য থাকবেই। না থাকলে তো জিনিসটা বড় একঘেয়ে হয়ে যাবে।
• আপনি তো প্রোফেসর শঙ্কুর চরিত্রে অভিনয় করলেন। এর আগে শৈবাল মিত্রর ছবিতে ব্যোমকেশ বক্সির চরিত্রেও অভিনয় করেছেন। কোনও দিন ‘‌ফেলুদা’ চরিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছা হয়নি?‌
•• (‌কিছুক্ষণ ভেবে)‌ কীভাবে উত্তর দিই!‌ হ্যাঁ হয়েছিল, নিশ্চয়ই হয়েছিল। মনে হয়েছিল ফেলুদা-‌টা করতে পারলে খুবই মজা হত। তবে সেটা করতে না পেরে যে খুব মর্মাহত হয়েছি, তাও নয়। কিছু কাজ হয়, কিছু কাজ হয় না। এটাই সত্যি।
• সন্দীপ রায় কী বললেন—আবার কি শঙ্কুকে নিয়ে ছবি করবেন?‌
•• সেটা তো আমরা সকলেই চাই। কিন্তু এই ছবিটা করতে তো প্রচুর পরিশ্রম গেছে, তাই আমরা সকলেই চাইব সেই পরিশ্রমটা আগে সফল হোক। ফেলুদার মতো শঙ্কুরও একটা সিরিজ হোক আমরা সকলেই চাই। সেটা নির্ভর করবে এই ‘‌প্রোফেসর শঙ্কু ও এল ডোরাডো’‌র সাফল্যের ওপর। প্রোফেসর শঙ্কু, নকুড়বাবু, প্রহ্লাদ বা নিউটন জনপ্রিয়তা পেল কি না, তার ওপর।
• নকুড়বাবুর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শুভাশিস মুখোপাধ্যায়। ওঁর সঙ্গে অভিনয় করতে কেমন লেগেছ?‌
•• শুভাশিসের সঙ্গে আমি আগেই ‘‌গোরস্থানে সাবধান’‌ করেছি। এই গল্পের নামই কিন্তু ‘‌নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো’‌। কাজেই এখানে এক অর্থে নকুড় মুখ্য চরিত্র। শুঙ্কুও এই ছবিতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এই যে দু’‌ধরনের মানুষ, এদের মধ্যে বোঝাপড়াটা খুবই জরুরি ছবিতে। প্রথম থেকেই কিন্তু সেই যুগলবন্দিটা হয়ে গিয়েছিল। কীভাবে হয়েছিল তার বিশ্লেষণ করাটা খুব মুশকিল। হয়তো সত্যজিৎ রায়ের লেখাই আমাদের রসায়নটা মিলিয়ে দিয়েছিল।
• ব্রাজিলের যে দুজন অভিনেতা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন, তাঁরা কি সত্যজিৎ রায় এবং প্রোফেসর শঙ্কু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন?‌
•• অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দৌলতে এখন সবকিছুই সম্ভব হয়ে উঠেছে। তবুও যে পরিচালকের একটু দুশ্চিন্তা ছিল না তা আমি বলব না। ব্রাজিলে গিয়ে যখন তাঁদের সঙ্গে মুখোমুখি আলাপ হল তখন পরিচালক বুঝলেন ঠিকঠাকই আছে। কোনও অসুবিধে নেই। তাঁরা এতটাই পেশাদার যে শুটিংয়ের আগেই এ বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা করে নিয়েছেন। তাঁরা শুধু সত্যজিৎ রায় বা শঙ্কু সম্পর্কেই ওয়াকিবহাল নয়, সত্যজিৎ রায়ের অন্যান্য গল্প সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল ছিলেন।
• আপনার আগামী কাজ কী কী?‌
•• কথাবার্তা তো সবসময়েই চলতে থাকে। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘‌ফেলুদা’‌ ওয়েব সিরিজে কাজ করছি। গল্পের নাম ‘‌ছিন্নমস্তার অভিশাপ’‌। এই গল্পে আমি কেদার চৌধুরির চরিত্রে অভিনয় করছি। একটা বড় হিন্দি ছবির অনেকটা শুটিং হয়ে গেছে। এটা রুমি জাফরির ছবি। এর আগে অনেক ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন। তবে ছবি পরিচালনা খুব বেশি করেননি। ছবিতে কয়েকজন খুবই জোরালো অভিনেতা আছেন।
• থিয়েটারের কাজ এখন করছেন?‌
•• এই মূহূর্তে থিয়েটার অনেকদিন করা হয়নি। এখন একটা ইংরেজি নাটক করার চেষ্টা চলছে। কয়েকবছর আগে শৈবাল মিত্রর পরিচালনায় ‘‌চিত্রকর’‌ নামে একটা ছবি করেছিলাম যার অনুপ্রেরণা ছিল সেই নাটক আর বিনোদবিহারি মুখোপাধ্যায়ের জীবনের ছায়া অবলম্বনে। সেই ইংরেজি নাটকটা ছিল এক দৃষ্টিহীন শিল্পী মার্ক রথকো কে নিয়ে। সেই মূল নাটকটাকেই মঞ্চে আনার চেষ্টা চলছে। প্রথম শো হবে গোয়ায়।

 

ছবি:‌ বিপ্লব মৈত্র
 

জনপ্রিয়

Back To Top