চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, সুদপুর (কাটোয়া): ভারতবর্ষের অন্যতম লোকনৃত্যশৈলী রণপা নৃত্যের পীঠস্থান হল কাটোয়া ১নং ব্লকের সুদপুর গ্রাম। প্রাচীনকালে যুদ্ধের সময় সৈন্যরা একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত যাতায়াতের জন্য বাঁশের তৈরি লাঠিতে বাঁশের পা-দানি আটকে তৈরি রণপা-র ব্যবহারের সূচনা। ‘রণ’ শব্দের মানেইতো যুদ্ধ। পরবর্তী সময়ে এই রণপা-এর দখল নেয় ডাকাতরা। গ্রামেগঞ্জে সম্পন্ন গৃহস্থদের বাড়ি ডাকাতির পর দ্রুত পিঠটান দেওয়ার জন্য ডাকাতরা এই রণপা ব্যবহার করত। নদী কাঁদর খাল বিল মাঠ জঙ্গলের মতো দুর্গম জায়গা অনায়াসে অতিক্রম করার এই মাধ্যমটিকে সুদপুর গ্রামের সংস্কৃতিচেতন মানুষজন লোকসংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। শিল্পীর উচ্চতার দুই তৃতীয়াংশ দৈর্ঘ্যের দুটি বাঁশের লাঠির নিচ থেকে এক বা দেড় ফুট উচ্চতার বাঁশ চিরে কঞ্চির সাহায্যে পা–দানি লাগিয়ে তৈরি হয় রণপা। বছরের শেষে চৈত্র সংক্রান্তির সময় রাজ্যের মূলত দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত হয় লোকসংস্কৃতির অঙ্গ বোলান গান ও নাচের আসর। সেই ধারার একঘেয়েমি ও গতানুগতিকতা কাটাতে সুদপুর গ্রামের বাসিন্দা সুধানন্দ বৈরাগ্য অনিল বন্দ্যোপাধ্যায় মধুসূদন প্রধানদের মতো সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষজন বোলান ও গাজন উৎসবে রণপাকে জুড়ে এক নতুন ধারার নৃত্যশৈলীর জন্ম দেন। পরবর্তীকালে এই গ্রামেরই বাসিন্দা ডাঃ হরমোহন সিংহ কাটোয়ার বিধায়ক থাকাকালীন রণপাকে দেশবিদেশের নানা প্রান্তের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অনুষ্ঠানে যুক্ত করে এই নৃত্যশৈলীকে প্রচারের আলোয় আনেন। সুদপুরের রণপা নাচ জওহরলাল নেহরু থেকে ইন্দিরা গান্ধী-সহ দেশবিদেশের বহু তাবড় ব্যক্তির তারিফ কুড়োয়। সুদপুরের রণপা-খ্যাতিতে উৎসাহিত হয়ে লাগোয়া বিজনগর নারায়ণপুর দে-পাড়া টিকরখাঁজির মতো গ্রামগুলির বোলানের দল রণপা নৃত্যশৈলী গ্রহণ করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে শ্রোতা-দর্শকের মনোরঞ্জন করে। সেই প্রথা আজও চলে আসছে।
তবে এত খ্যাতি পেলেও শ্রমজাত এই লোকনৃত্যটি যাতে টিকে থাকতে পারে সে ব্যাপারে সরকারি স্তরে বেশি বেশি উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে দাবি সুদপুর গ্রামের শিল্পী দুলু হাজরা চাঁদ দাস কেষ্ট হাজরাদের। কাটোয়ার বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় জানান, বামজমানায় রণপা শিল্পী-সহ বিভিন্ন ঘরানার লোকশিল্পীদের জন্য কিছুই করা হয়নি। মমতা ব্যানার্জি সরকার শিল্পীদের নিয়মিত অনুষ্ঠানের সুযোগ করে দিয়েছে। পরিচয়পত্র করে দিয়েছে। সব থেকে বড় কথা হল শিল্পীদের মর্যাদা দিয়েছে। লোকশিল্পীসমাজের উন্নতির জন্য আমাদের সরকারের আরও বেশকিছু পরিকল্পনা রয়েছে।
মধ্যপ্রদেশের লোকনৃত্যশৈলী ‘গেদি গেদি’ নৃত্যের সঙ্গে রণপা নৃত্যের মিল আছে। এখানকার তফসিলি জাতির সদস্যরাই এই রণপা নৃত্যশৈলীকে টিকিয়ে রেখেছেন। এই নাচের সঙ্গে পুরাণের বিভিন্ন ঘটনাবলি অবলম্বনে লোকসঙ্গীত পরিবেশিত হয়। শিল্পীরা যোদ্ধার বেশভূষায় নাচ-গান পরিবেশন করেন। এই নৃত্যে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রগুলি হল, ঢোল, কাঁসি, ঝাঁঝ, ঝুমঝুমি, আড়বাঁশি, ড্রাম, মাদল প্রভৃতি। সমাজের উঁচুতলা থেকে একেবারে নিচুতলা পর্যন্ত এই নৃত্যশৈলীতে মজেন না, এমন মানুষ মেলা কঠিন। নৃত্যশৈলীর প্রসারে বাধা যেমন দারিদ্র্য, তেমনি বিশ্বায়নের হাঁ মুখও।

ভারতের অন্যতম লোকনৃত্যশৈলী রণপা। ছবি:‌ বুবাই মজুমদার

Back To Top